বাংলাদেশ সরকার দেশের তিনটি সমুদ্রবন্দর—মোংলা, চট্টগ্রাম ও পায়রা—সহ মোট ছয়টি বন্দরে ভুটানকে ‘পোর্ট অব কল’ হিসেবে ব্যবহার করার অনুমতি দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে ভুটান তার পণ্যবাহী জাহাজগুলো বাংলাদেশের এসব বন্দরের মাধ্যমে অবাধে চলাচল করতে পারবে, যা দ্বিপক্ষীয় ট্রেড এবং ট্রানজিটের জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। পাশাপাশি ভুটানের পণ্যবাহী জাহাজের বাংলাদেশে প্রবেশ ও বাহিরের পয়েন্টও বাড়ছে। যদি সব কিছু ঠিক হয়, তবে এসব বন্দর ও পয়েন্টের অন্তর্ভুক্তির জন্য বাংলাদেশ ও ভুটান স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রক্রিয়ার (এসওপি) সংশোধনের ওপর একমত হতে যাচ্ছে। এই সিদ্ধান্ত আজ, ১৫ জুন, অনুষ্ঠিত হওয়া দুই দেশের যৌথ কারিগরি কমিটির (জেটিসি) বৈঠকে চূড়ান্ত করা হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের ও ভুটানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) অনুযায়ী ‘ইউজ অব ইনল্যান্ড ওয়াটারওয়েজ ফর ট্রান্সপোর্টেশন অব বিলেটারাল ট্রেড অ্যান্ড ট্রানজিট কার্গো’ শীর্ষক এএমওইউ-এর আওতায় ট্রেডের জন্য এসওপি নির্ধারণ করা হয়েছে। এই এমওইউতে এখন পর্যন্ত শুধু নারায়ণগঞ্জ বন্দরকে পোর্ট অব কল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এখন যদি আরও ছয়টি বন্দরকে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়, তবে ভুটান তাদের মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে সহজে পণ্য পরিবহন করতে পারবে। তবে এই নিয়ম অনুযায়ী, ‘পোর্ট অব কল’ হিসেবে স্বীকৃত বন্দরে পণ্য ওঠানামা করার অনুমোদন দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, ভুটানের সঙ্গে সরাসরি নৌপথ না থাকলেও তারা ভারত হয়ে সীমিত আকারে পণ্য পরিবহন করে থাকে।
এ বিষয়ে জানাতে গিয়ে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) চেয়ারম্যান কমোডর গোলাম সাদেক বলেছেন, আমরা চাই আমাদের প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে আরও উন্নত কানেকটিভিটি থাকুক। এজন্য তিনি জানিয়েছেন, ভুটানের জন্য তিনটি সমুদ্রবন্দরসহ মোট ছয়টি বন্দরে ‘পোর্ট অব কল’ এর অনুমতি দেওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে। এসব বন্দর ব্যবহারের মাধ্যমে ভুটানের পণ্য বাংলাদেশে কম খরচে ও দ্রুত পৌঁছাবে, পাশাপাশি বন্দর ব্যবহারের ফিওও কমে যাবে।
দ্বিপাক্ষিক এই আলোচনাটি পরিচালনা করছেন নিওপরিবহন মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব ড. এটিএম মোনেমুল হক। তিনি জানান, এসওপির কিছু সংশোধনের জন্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। আলোচনার মাধ্যমে এর নীতিগত সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করে পরবর্তীতে চূড়ান্ত করা হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ ও ভুটানের মধ্যে মোট ছয়টি বন্দরে ‘পোর্ট অব কল’ করার বিষয়ে আলোচনা চলছে।
প্রমাণিত হয়েছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৭ সালের ১৮ এপ্রিল ভুটানে একটি সফরকালে দুই দেশের মধ্যে অভ্যন্তরীণ নৌপথে পণ্য পরিবহণ ও ট্রানজিট সংক্রান্ত এমওইউ স্বাক্ষর করেন। এরপর ২০১৯ সালের ১৩ এপ্রিল ওই এমওইউ অনুযায়ী এসওপি-ও স্বাক্ষর হয়। তবে এখন পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ বন্দর থেকে একজন ভুটানের পাথর নিয়ে এসেছে। এই জাহাজটি ছিল ভারতের ধুবরী থেকে ১ হাজার ৫ টন পাথর নিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। বাংলাদেশ-ভারত নৌপ্রটোকল অনুযায়ী ইতিমধ্যে ১৯টি জাহাজ ভুটানের পণ্য আমদানি করেছে। এগুলো ভারতের ধুবরী থেকে কুড়িগ্রামের চিলমারীতে এসেছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এসওপির আওতায় আছে দুটি নৌপথ—একটি চট্টগ্রাম-চাঁদপুর, মাওয়া, আরিচা, সিরাজগঞ্জ, চিলমারী-ধুবরী পোর্টের দিকে এবং আরেকটি মোংলা-কাউখালী, বরিশাল, চাঁদপুর, মাওয়া, আরিচা, সিরাজগঞ্জ, চিলমারী ও ধুবরীর দিকে। এই দুই রুটের মূল পোর্ট অব কল ছিল নারায়ণগঞ্জ। ভুটান সরকার আরও অনুরোধ করেছে, ছয়টি নতুন বন্দর—চিলমারী, বাহাদুরাবাদ, সিরাজগঞ্জ, আরিচা, মাওয়া এবং চাঁদপুর—কে ‘পোর্ট অব কল’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে। এই প্রস্তাবের সত্যতা পাওয়া গেছে যেখানে, বাংলাদেশ নীতিগতভাবে এ বিষয়ে সম্মত হয়ে যাচ্ছে।
তবে সবকিছু চূড়ান্ত হলে ভুটান তাদের পণ্য আনার জন্য তৃতীয় কোনো দেশের কাছ থেকে আসা পণ্য নিম্নোক্ত বন্দরে আমদানি করে নিজ দেশে নিয়ে যেতে পারবে। বর্তমানে বাংলাদেশের মোংলা বন্দরে শুধু ভারতের সঙ্গে নৌপ্রটোকলের আওতায় ‘পোর্ট অব কল’ স্বীকৃতি রয়েছে। সূত্র থেকে জানা গেছে, ভুটান তার ১৪টি পয়েন্টকে প্রবেশ ও বাহিরের জন্য পয়েন্ট হিসেবে স্বীকৃতি চায়। এর মধ্যে পাঁচ-ছয়টি পয়েন্টে আইনের জন্য বাংলাদেশের সম্মতি রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মোংলা, দৈখাওয়া, চিলমারী, চট্টগ্রাম ও পায়রা বন্দর।