বাংলাদেশ ব্যাংক তফসিলি ব্যাংকগুলোকে খেলাপি ঋণ সংক্রান্ত বিরোধ দ্রুত ও কার্যকরভাবে নিষ্পত্তি করার জন্য দক্ষ মধ্যস্থতাকারী (মেডিয়েটর) নিয়োগের নির্দেশনা জারি করেছে। বুধবার কেন্দ্রীয় ব্যাংক ওই নির্দেশনা একটি সার্কুলারের মাধ্যমে প্রকাশ করেছে।
নতুন উদ্যোগে বিশেষভাবে ‘প্রাক-মামলা মধ্যস্থতা’ পদ্ধতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে—অর্থাৎ আদালতে মামলা দায়েরের আগে বিরোধসমূহ বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (এডিআর) প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মীমাংসার ব্যবস্থা করা হবে। এর মাধ্যামে বিচারব্যবস্থায় মামলার ঝুঁকি কমানো এবং সময় ও খরচ বাঁচানোই লক্ষ্য। কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে যে এই ধরণে এমন সব বিরোধও আদালতে যাওয়ার আগে সমাধানের সুযোগ পাবে, যেগুলো সম্ভবত অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ ও দেউলিয়া আইন, ১৯৯৭-এর আওতায় পড়তে পারে।
সার্কুলারে তফসিলি ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এডিআর পদ্ধতির মাধ্যমে ২০২৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে মোট খেলাপি ঋণের অন্তত ১ শতাংশ নিষ্পত্তি করতে হবে। চলতি অর্থবছরের শেষ দিনটিকে লক্ষ্য করে নির্ধারিত এই সময়সীমা ব্যাংক খাতের তারল্য ও আর্থিক স্থিতি উন্নয়নে নিয়ন্ত্রকের গুরুত্বপ্রকাশ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমান সময়ে ব্যাংকখাতে অনাদেয় ঋণ বড় পরিমাণে থাকায় মধ্যস্থতার মাধ্যমে এই ১ শতাংশ রিকভারি জাতীয় পর্যায়ের ঋণ পুনরুদ্ধার কার্যক্রমে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নতুন নির্দেশনাটি ২০২৪ সালের ২২ মে জারি করা কেন্দ্রীয় সার্কুলার (বিএরপিডি সার্কুলার নং-১১) এর ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে, তবে এতে আদালতে মামলা করার আগেই বিরোধ নিষ্পত্তির ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে।
বৈধতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, মধ্যস্থতাকারী নির্বাচনের জন্য ব্যাংকগুলোকে আইন অনুযায়ী গঠিত বিশেষায়িত মধ্যস্থতা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের প্যানেল থেকে মধ্যস্থতাকারী বাছাই করতে হবে। এসব প্যানেেলে সাধারণত অবসরপ্রাপ্ত বিচারক, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবসরপ্রাপ্ত কর্তাব্যক্তি এবং অভিজ্ঞ পেশাজীবীরা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারেন।
সার্কুলারে মধ্যস্থতাকারী নির্বাচনের জন্য ১০টি যোগ্যতা ও অযোগ্যতার শর্ত নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রধান শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে প্যানেল সদস্যপদ যাচাই, নিরপেক্ষতা, পেশাগত সুনাম, বিশেষজ্ঞ দক্ষতা, মধ্যস্থতার জ্ঞান এবং প্রমাণিত অভিজ্ঞতা। এছাড়া পরিষ্কার আইনি রেকর্ড, আর্থিক সততা, ঋণখেলাপি না থাকা এবং পর্যাপ্ত আর্থিক সক্ষমতা থাকা বাধ্যতামূলক রাখা হয়েছে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী ব্যাংকগুলোকে মধ্যস্থতাকারী নিয়োগের সময় কঠোর প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে; নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হলফনামা ও অঙ্গীকারপত্র গ্রহণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রাহকদের মধ্যস্থতা সুবিধা ও প্রক্রিয়ার বিষয়ে সক্রিয়ভাবে অবহিত করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, আদালতের বাইরে দ্রুত সমঝোতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করে দীর্ঘমেয়াদি আইনি জট ও সময় খরচ কমানো এবং ঋণ পুনরুদ্ধার কার্যকারিতা বৃদ্ধি করাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। বর্তমান অনাদেয় ঋণের চ্যালেঞ্জকে মাথায় রেখে এ ধরনের প্রাক-মামলা মধ্যস্থতা জাতীয় স্তরে ঋণ পুনরুদ্ধারে কার্যকর সহায়ক হিসেবে বিবেচিত হবে।

