কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক চাপ বাড়বে। প্রধান প্রতিকূলতার ধারা হবে টাকার মানের অবমূল্যায়ন ও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া — যা সরাসরি মূল্যস্ফীতিকে বাড়াবে এবং বৈদেশিক রিজার্ভে চাপ তৈরি করবে।
প্রতিবেদনে মডেলগুলোতে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম, দেশের বাজারে তেলের দাম সমন্বয়, ডলারের হার ও রিজার্ভ ব্যবহারকে ধরা হয়েছে। একটি কন্ডিশনাল হিসাব অনুযায়ী, যদি চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে আন্তর্জাতিকভাবে জ্বালানি তেলের দাম ৭০% বেড়ে যায় এবং দ্বিতীয় প্রান্তিকে আরও ৩০% বাড়ে, আর একই সময়ে টাকার মান প্রথম প্রান্তিকে ৫% এবং দ্বিতীয় প্রান্তিকে আরও ৫% অবমূল্যায়িত হয়, তাহলে ডিসেম্বর পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির উপর সমন্বিত ধাক্কায় হার বাড়ে প্রায় ১১.৬৭%—এ সময় ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে ৯.৫৬%। এই কেসেই রিজার্ভও কমে ৩ হাজার ২৭২ কোটি ডলারের মাপ থেকে নেমে আসতে পারে ২ হাজার ৬০৬ কোটি ডলারে।
একটি আরও তীব্র পরিস্থিতি ধরলে—যেখানে প্রথম প্রান্তিকে টাকার অবমূল্যায়ন ৫% এবং দ্বিতীয় প্রান্তিকে ১০% ধরে নেওয়া হয় এবং জ্বালানি তেলের দাম অনিয়মিতভাবে বেড়ে যায়—তাহলে একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডিসেম্বরের মধ্যে মূল্যস্ফীতি ১২.২৮% পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এ অবস্থায় রিজার্ভ কমে পড়ার সম্ভাব্য পরিমাণ ধরা হয়েছে ২ হাজার ৪২৪ কোটি ডলার। প্রতিবেদনে আরেকটি সঙ্কেত ছিল যে, বর্তমান ভিত্তি অনুযায়ী রিজার্ভ ৩১.১২ বিলিয়ন থেকে ২৪.২৪ বিলিয়ন (অর্থাৎ প্রায় ২,৪২৪ কোটি ডলার) পর্যায়ে নেমে আসতে পারে।
তবে প্রতিবেদনে সতর্কতা জুড়ে বলা হয়েছে যে এই সব হিসাব ধারণাভিত্তিক; মডেলগুলোতে তেল ও ডলারের দাম ধরে নেওয়া হয়েছে। যদি বৈশ্বিক তেলের দামে আকস্মিক বড় ধরনের পরিবর্তন না ঘটে, তবু ডিসেম্বরের মধ্যে মূল্যস্ফীতির হার প্রায় ১০.৫%-এর মধ্যে থাকতে পারে বলেই চিহ্নিত করা হয়েছে।
পূর্বের বাস্তব চিত্র হিসেবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে গত মার্চে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৭১% এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্রে রোববার পর্যন্ত গ্রস রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩ হাজার ৪৪৩ কোটি ডলার।
রিপোর্টে নীতিগত পরামর্শও দেওয়া হয়েছে — আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়বে এবং রিজার্ভে চাপ পড়বে। মুদ্রাবাজার স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে বাজারে হস্তক্ষেপ করে ডলার বিক্রি করতে হতে পারে, যার ফলে রিজার্ভ দ্রুত কমে যাবে। ফলত, রিজার্ভ রক্ষা ও বাজারে যোগান শোধন করতে বিনিময় হারে কিছুটা নমনীয়তা আনতে হতে পারে, অথবা দরকার পড়লে ডলারের দাম বাড়াতে হবে। একই সাথে সরকার যদি অভ্যন্তরীণভাবে অতিরিক্ত রাজস্ব সংগ্রহ করে এবং বাজারে জ্বালানি তেলের দাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রাখে, তাহলে মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
সংক্ষেপে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিশ্লেষণ থেকে পরিষ্কার যে — জ্বালানি তেল ও ডলারের দামের অস্বাভাবিক উত্থান টাকার মূল্য ও আমদানি ব্যয়ের ওপর সরাসরি চাপ তৈরি করে, যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভোক্তা মূল্যস্ফীতিকে ত্বরান্বিত করবে। তাই সরকার ও নীতিনির্ধারকরা সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিলে ক্ষতিকর পরিণতি মোকাবেলা করা সম্ভব। সূত্র: যুগান্তর অনলাইন

