জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার দেশের প্রতিটি সরকারি প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ করছে, যা প্রকৃত অর্থে আবারও একটি ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। তিনি মনে করেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড মানে ‘অলিখিত বাকশাল’ প্রতিষ্ঠার সাথে সমান সমান। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, স্বৈরাচারী শাসনের পতনের আড়াই দশক পেরিয়ে গেলেও তাদের দমনমূলক নীতিগুলো এখনো বহাল রয়েছে। তারা আবার নতুন করে ফ্যাসিবাদ কায়েমের চেষ্টা চালাচ্ছে, जिसे ঠেকাতে আমাদের আপসহীন প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে বলে হুঁশিয়ারি দেন জামায়াতের এই নেতা।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) রাতে সংসদীয় অধিবেশন শেষে মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে, গুম প্রতিরোধ, বিচার বিভাগ ও স্থানীয় সরকার সংক্রান্ত বিতর্কিত বেশ কিছু বিলের বিরোধিতা করে বিরোধী দল সংসদ থেকে স্বেচ্ছায় ওয়াকআউট করে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আজকের সংসদে এমন কিছু জনবিরোধী বিল উত্থাপন করা হয়েছে যা স্পষ্টতই সাধারণ মানুষের অধিকার হরণ করে। আমরা যখন এ বিষয়ে প্রতিবাদ জানাতে চাইক, তখন আমাদের কথা বলার জন্য সময়ের সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। বিরোধী সদস্যদের জন্য মাত্র দুই থেকে ছয় মিনিট সময় বরাদ্দ থাকলেও, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলে যান, যা সংসদীয় নিয়মের সাথে সাংঘর্ষিক। স্পিকারের এমন গায়ের জোর আচরণ সংসদীয় রীতির ক্ষতি করছে এবং বিরোধী দলের কণ্ঠ রোধের অপচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংকটের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, আমরা মনে করি, দেশের বিচার বিভাগকে সম্পূর্ণ স্বাধীন রাখতে হবে। কিন্তু বর্তমান সরকার বেশ কিছু বিল পাস করছে, যার মাধ্যমে বিচারকের নিয়োগ ও নিয়ন্ত্রণ নির্বাহী বিভাগের হাতে চলে যাচ্ছে। ২০০১-০৬ এর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ের নিরপেক্ষ নির্ধারিত ব্যবস্থা বাতিল করে তারা পুরাতন অবস্থায় ফিরে গেছে। এতে করে, তারা প্রমাণ করছে— কিছু খারাপ হলেও হাসিনার নীতি তাদের জন্য আদর্শ। এটি বিচার বিভাগের ওপর হঠাৎ ও বেআইনি হস্তক্ষেপ, যার ফলে অতীতে যেমন বিচারপতি খায়রুল হক ও মানিকের মতো রাজনৈতিক বিভাজনের বিচারপতির উদাহরণ তৈরি হয়েছে, ভবিষ্যতেও একই ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটতে পারে।
স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে, যেমন জেলা পরিষদ, উপজেলা, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা সংক্রান্ত বিলের কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সরিয়ে, বেপরোয়াভাবে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। বিএনপি তাদের ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবে স্পষ্টভাবে বলেছিল, বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া প্রশাসক বসানো উচিত নয়। কিন্তু এই সরকার কোনও যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই প্রতিটি পর্যায়েই দলীয়করণ চালিয়ে যাচ্ছে, যা স্থানীয় সরকারের মূল কাঠামোকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিচ্ছে।
শেরপুর ও বগুড়া উপ-নির্বাচনে নির্বাচনপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করে জামায়াতের আমির বলেন, ‘১৯৯৪ সালের মাগুরা নির্বাচনের কলঙ্কিত ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি আজ বগুড়া ও শেরপুরের নির্বাচনে দেখা গেছে। জনগণের ভোটাধিকার লুণ্ঠনের জন্য একই ধরনের জালিয়াতি ও অসাধু পদ্ধতি আবার ফিরে এসেছে। শেরপুর-৩ আসনে আমাদের একজন কর্মীকে হত্যা করা হয়েছে, এরপর আজ আরেকজন কর্মীও নিহত হয়েছেন। আমরা এই হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।
ডা. শফিকুর রহমান দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে বলেন, আমরা সংসদ বর্জন করিনি, বরং সংসদে গিয়ে জনগণের অধিকারের পক্ষে কথা বলব। তবে যদি জনগণের স্বার্থের সাথে বিরোধী কোনও আইন পাস হয়, তাহলে আমাদের কণ্ঠ আবারো গর্জে উঠবে। আমরা জানি, জনগণ অতীতে ফ্যাসিবাদী শক্তিকে রুখে দিয়েছে, ভবিষ্যতেও যদি কেউ নতুন করে বাকশাল বা ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার প্রয়াস চালায়, তবে আমরা একসঙ্গে দাঁড়িয়ে তা ঠেকিয়ে দেব।
সংবাদ সম্মেলনে বিরোধী দলের চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামসহ অন্যান্য শীর্ষ নেতা, জামায়াতে ইসলামী এবং বিরোধী জোটের বিভিন্ন সংসদ সদস্য উপস্থিত ছিলেন।

