ভারতের খ্যাতনামা সঙ্গীতশিল্পী আশা ভোঁসলে আজ রোববার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। তিনি মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছিলেন। তার বয়স হয়েছিল ৯২ বছর। আশা ভোঁসলের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন তার ছেলে আনন্দ ভোঁসলে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি, হিন্দুস্তান টাইমস এবং আনন্দবাজারের প্রতিবেদনে জানা গেছে, শনিবার সন্ধ্যার পর থেকে তিনি অস্বস্তি অনুভব করেছিলেন। পরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় রোববার দুপুরে তিনি মারা যান। আশা ভোঁসলের নাতনি জানাই ভোঁসলে ইনস্টাগ্রামে লিখেছেন, ‘আমার দাদি আশা ভোঁসলে অতিরিক্ত ক্লান্তি ও বুকে সংক্রমণের কারণে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আমরা সবাই তার ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি সম্মান জানাচ্ছি। তার চিকিৎসা চলছে আর আমরা আশাবাদী খুব শিগগিরই সব কিছু স্বাভাবিক হবে। আশা করছি খুব দ্রুত ইতিবাচক খবর জানাতে পারব।’ আশা ভোঁসলের জন্ম ১৯৩৩ সালে। তিনি ভারতের সংগীতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। কয়েক দশক ধরে তার কণ্ঠে গাওয়া অসংখ্য জনপ্রিয় গান শ্রোতাদের মন জয় করে এসেছে। শনিবার হাসপাতালে ভর্তির খবর প্রকাশের পর দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজের এক্স (টুইটার) অ্যাকাউন্টে শোকপ্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আশা ভোঁসলে হাসপাতালে ভর্তি খবর শুনে আমি গভীর উদ্বিগ্ন। তার দ্রুত সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করছি।’ আশা ভোঁসলে ভারতের অন্যতম আইকনিক ও বহুমুখী প্লেব্যাক সঙ্গীতশিল্পী। তাঁর ক্যারিয়ার প্রায় আট দশক ধরে চলেছে, যেখানে তিনি হিন্দি ছাড়াও বিভিন্ন ভারতীয় ভাষা ও বিদেশি ভাষায় হাজার হাজার গান রেকর্ড করেছেন। শাস্ত্রীয় সংগীত, লোকসংগীত, পপ ও গজল—বিভিন্ন ধরণের সংগীতের সঙ্গে তিনি বিশেষভাবে পারদর্শী। তার এই বহুমুখীতা তাঁকে ভারতের সংগীত ইতিহাসে অনন্য স্থান করে দিয়েছে। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি অসংখ্য সম্মাননা পেয়েছেন, যার মধ্যে ছয় বার রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার’, ‘পদ্মবিভূষণ’ ও অন্যান্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ফিল্মফেয়ার পুরস্কার অন্যতম। তিনি ভারতের সর্বকালের অন্যতম সেরা ও সর্বাধিক সম্মানিত প্লেব্যাক গায়কদের একজন। ১৯৪০-এর দশকে তার সংগীতজীবন শুরু হয়, যা সংগ্রামের সময়েও অব্যাহত ছিল। বড় বোন লতা মঙ্গেশকরের সঙ্গে তার সাংগঠনিক ও শিল্পীজীবনের পথচলা শুরু হলেও, ১৯৫০ দশকে সুরকার ওপি নায়ারের সঙ্গে কাজ করে তিনি আলাদা জনপ্রিয়তা পান। পরে আরডি বর্মণের সঙ্গে তার কাজ ভারতীয় সংগীতের নতুন ধারা সৃষ্টি করে, যেখানে আধুনিকতা ও পাশ্চাত্য প্রভাবের সঙ্গে পরীক্ষামূলক সুরের সংমিশ্রণ দেখা যায়। আশা ভোঁসলে বিভিন্ন ধরনের গান গাইতে পারতেন—ক্ল্যাসিক্যাল, গজল, পপ, ক্যাবারে, লোকগানসহ নানা একটি রঙিন সংগীতজগা। তার কণ্ঠে জনপ্রিয় গান ‘পিয়া তু আব তো আজা’, ‘দম মারো দম’, ‘ইন আঁখো কি মস্তি’ ইত্যাদি আজও কালজয়ী। লাখ লাখ গান তিনি রেকর্ড করেছেন, শুধুমাত্র হিন্দি নয়, বিভিন্ন আঞ্চলিক ভাষা ও আন্তর্জাতিক ভাষাতেও। তার ক্যারিয়ারে তিনি বহু পুরস্কার পেয়েছেন, যার মধ্যে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ও ভারতের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান পদ্মবিভূষণ অন্যতম। সাত দশকের অধিক দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি প্রমাণ করেছেন, জনপ্রিয়তা কেবল সময়ের ফসল নয়, এটি এক দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব—যা সময়ের আবর্তে টিকে থাকে এবং আমাদের সাংস্কৃতিক স্মৃতি সমৃদ্ধ করে রেখেছে।

