কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীর (৫২) নামে এক কথিত পীরকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা। গতকাল শনিবার বেলা আড়াইটার দিকে উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের ফিলিপনগর গ্রামে তাঁর দরবার শরিফে এ ঘটনা ঘটে। হামলাকারীরা দরবারে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগও করে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কয়েক বছর আগের ৩০ সেকেন্ডের একটি ভিডিও শুক্রবার সকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওটিতে শামীমকে পবিত্র কোরআন সম্পর্কে অবমাননাকর মন্তব্য করতে শোনা যায় বলে দাবি করেন এলাকাবাসী। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই এলাকায় উত্তেজনা বাড়তে থাকে। শনিবার সকালে শামীমের দরবার থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে আবেদের ঘাট এলাকায় শতাধিক মানুষ জড়ো হন। দুপুরের পর তারা মিছিল নিয়ে দরবারের দিকে অগ্রসর হন এবং পুলিশের উপস্থিতিতেই শামীমকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে হত্যা করেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ১৮ মিনিটের একটি ভিডিওতে দেখা যায়, শতাধিক মানুষ স্লোগান দিতে দিতে শামীমের দরবারের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মিছিলের একটি অংশ দরবারের দুটি পাকা ভবন ও একটি টিনশেড ঘরে ঢুকে ভাঙচুর চালায় এবং ভবনের ছাদসহ বিভিন্ন স্থানে আগুন ধরিয়ে দেয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলার সময় দরবারের ভেতরে থাকা পাঁচ থেকে সাতজন আহত হন। অন্যরা পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। পরে ফায়ার সার্ভিস এসে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শামীম রেজা ইসলামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শুরু করেন। পরে ফিলিপনগর উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসএসসি, কুমারখালী ডিগ্রি কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ভেড়ামারা কলেজ থেকে বিকম পাস করেন। পরবর্তীতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে এমকম সম্পন্ন করেন। শিক্ষাজীবন শেষে তিনি কেরানীগঞ্জে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি নেন। পরে চাকরি ছেড়ে গোলাম-এ-বাবা কালান্দার জাহাঙ্গীর সুরেশ্বরীর মুরিদ হন এবং সেখানে খাদেম হিসেবে বসবাস শুরু করেন। ২০১৮ সালে পৈতৃক বাড়িতে ফিরে এসে তিনি নিজ দরবার প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে গানবাজনার আয়োজন হতো।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২১ সালের মার্চে তাঁর এক অনুসারীর শিশুপুত্রের মরদেহ বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে দাফনের একটি ভিডিও ভাইরাল হলে তিনি আলোচনায় আসেন। একই বছরের সেপ্টেম্বরে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিন মাস কারাভোগের পর তিনি আবার দরবারে ফিরে আসেন এবং আগের মতোই কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকেন।
কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন বলেন, “শামীম রেজাকে উদ্ধার করার চেষ্টা করা হলেও বিক্ষুব্ধ জনতার তুলনায় পুলিশ সদস্য সংখ্যা কম ছিল। এ কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে।”
দৌলতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা তৌহিদুল হাসান জানান, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে শামীমের মৃত্যু হয়েছে। আহত দুজন—এক নারী ও এক পুরুষ—বর্তমানে শঙ্কামুক্ত।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ জানান, নিহতের মরদেহ কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। তাঁর ভাই একটি হত্যা মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন-হাসান বলেন, “এলাকার পরিস্থিতি এখন শান্ত। তবে বিজিবির টহলসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন রয়েছে। আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে এবং তাদের বাড়িতেও পুলিশি পাহারা থাকবে।” তিনি জানান, দৌলতপুরের হোসেনাবাদের লালনশিল্পী শফি মণ্ডলের গ্রামের বাড়িতেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
কুষ্টিয়ার এই ঘটনা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধর্ম অবমাননার অভিযোগে সংঘটিত ধারাবাহিক মব সহিংসতার আরেকটি উদাহরণ। ২০২৫ সালের ৫ সেপ্টেম্বর রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে নুরাল পাগলা নামে এক কথিত পীরের মরদেহ কবর থেকে তুলে পিটিয়ে ও পুড়িয়ে ফেলে জনতা। একইভাবে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর ময়মনসিংহের ভালুকায় দীপু চন্দ্র দাস নামে এক শ্রমিককে পিটিয়ে হত্যা করে বিবস্ত্র অবস্থায় গাছে ঝুলিয়ে তার লাশে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। মানবাধিকার সংগঠন আসকের ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বছর মব সহিংসতায় প্রাণ গেছে ১৯৭ জনের।
কুষ্টিয়া-১ আসনের বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য রেজা আহম্মেদ বাচ্চু মোল্লা বলেন, “সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। হত্যা করার অধিকার কাউকে দেয়নি। সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া উচিত।”

