নওগাঁর নিয়ামতপুরে জমি ভাগবাটোয়ারা নিয়ে বিরোধের জের ধরে একই পরিবারের চারজনকে গলাকেটে হত্যার ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। হত্যা কাজে ব্যবহৃত ধারালো হাসুয়া ও ছুরি উদ্ধার করা হয়েছে—সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়েছেন নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম।
পুলিশ সুপারের ভাষ্য অনুযায়ী, গত রাত্রিতে (২১ এপ্রিল) উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে একটি নির্মম হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আলামত সংগ্রহ ও তদন্ত শুরু করে। পরের দিন (২২ এপ্রিল) বিকেলে জেলা পুলিশের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার এই তথ্য জানান।
পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন সবুজ রানা (২৫), শহিদুল ইসলাম ও শহিদুলের ছেলে শাহিন মন্ডল। তাদের মধ্যে দুইজন পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। ঘটনার সাথে জড়িত আরও কয়েকজনকে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে; তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম এখনও প্রকাশ করা হয়নি।
পুলিশের উপাত্তে জানা গেছে, নিহত নমির উদ্দিনের সন্তান ও নাতি–নাতনীদের মধ্যে জমি-বিতর্ক ছিল। নমির উদ্দিনের এক ছেলে ১৩ বিঘা জমি পেয়েছিলেন এবং প্রতিটি মেয়েকে ১০ কাঠা করে জমি দেওয়া হয়েছিল। এ নিয়ে বোনদের ও তাদের জামাইদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয়। পুলিশ জানিয়েছে, দুই দিন আগে সবুজ এবং নিহত হাবিব একযোগে কিছু টাকা নিয়ে গরু কিনতে গিয়েছিলেন—সেই সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে তাদের মধ্যেকে আক্রমণের পরিকল্পনা গড়ে ওঠে।
পুলিশ সুপার জানান, হত্যাকাণ্ডটি পরিকল্পিত ছিল। রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টা থেকে ১২টার দিকে শহিদুল, স্বপন (নিহতের চাচাতো ভাই), সবুজ ও শাহিন মিলে হাবিবুর রহমানের ঘরে ঢুকে তাকে বড় ধারালো হাসুয়া দিয়ে জবাই করে। পরে তারা ধারাবাহিকভাবে হাবিবের স্ত্রী পপি সুলতানা ও তাদের দুই সন্তান—পরভেজ (৯) ও সাদিয়া আক্তার (৩)—কেও হত্যা করে।
প্রকৃত ঘটনাপ্রবাহ অনুযায়ী, হামলাকারীরা বাড়ির বাইরে থেকে নমির উদ্দিনের ঘরের দরজায় ছিটকানি লাগিয়ে তাকে ঘর থেকে বের হতে বাধা দেয়। নিহতের পরিবারের খেতে বা ঘরের আশেপাশে ধরা–ছড়ি লুকানো ছিল—পুলিশ আলামত থেকে এসব উদ্ধার করেছে। পপি খাবার খেয়ে ঘর থেকে বের হলে সবুজ তাকে হামলা করে এবং পরে শিশুদের ঘরে ঢুকে তাদেরও হত্যা করা হয়।
হাসুয়া ও ছুরি উদ্ধার হয়েছে; একটি বড় ধারালো হাসুয়া শহিনের বাড়ির কাছে থেকে উদ্ধার করা হয় এবং পরে পুকুর থেকে আরেকটি ধারালো ছুরি উদ্ধার করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।
নিহত পপি সুলতানার বাবা মোয়াজ্জেম হোসেন নিয়ামতপুর থানায় অজ্ঞাতনামা আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষুব্ধ জনতা সবুজের বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ওই এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়ন করা হয়েছে এবং পুলিশকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে যাতে কেউ নিরপরাধ মানুষকে কষ্ট না পায়।
পুলিশ মামলার তদন্তে দ্রুতগতিতে কাজ করছে এবং গ্রেপ্তারকৃতদের আদালতের মাধ্যমে রিমান্ডে নিয়ে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। নিঃসন্দেহে এই নির্মম হত্যাকাণ্ড এলাকার মানুষকে শিহরিত করেছে এবং পুলিশ দাবি করেছে, হত্যার মূল কারণ গ্রাম্য জমি-বিতর্ক এবং উত্তরাধিকার নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা।

