শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের বহুল আলোচিত ও ঐতিহাসিক ভাবনার নিবন্ধ ‘একটি জাতির জন্ম’ পাঠ্যবইয়ে সম্পূর্ণভাবে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য শিক্ষাবিদ ও ইতিহাসবিদরা বিশেষভাবে পরামর্শ দিচ্ছেন। তারা বলছেন, এই সংযোজনের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধের ফলে গড়ে ওঠা জাতির ইতিহাস সম্পর্কে সঠিক ও গভীর ধারণা লাভ করতে পারবে।
১৯৭২ সালে প্রথম স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে এই নিবন্ধটি অধুনালুপ্ত ‘দৈনিক বাংলা’ পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে স্বাধীনতা দিবসের উপলে ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’ তে এটি পুনর্মুদ্রিত হয়।
আগামীকাল বাংলাদেশে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৪৫তম শাহাদতবার্ষিকী পালিত হবে। এই উপলক্ষে তার জীবন, কর্ম, মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতায় তার অসামান্য অবদান নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য, বাংলাদেশের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে তার ‘একটি জাতির জন্ম’ নিবন্ধটিকে পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবিও ওঠে।
বাংলা একাডেমির সভাপতি ও স্বনামধন্য শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক এই নিবন্ধটিকে এক ‘ঐতিহাসিক দলিল’ হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন। তিনি বলেন, এটি একটি চমৎকার ও গুরুত্বপূর্ণ লেখা, যা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত।
তেমনি, ইতিহাসবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেনও এ মতের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, এটি অবশ্যই পাঠ্যবইয়ে থাকা দরকার। কারণ, মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস দিন দিন ক্ষীণ হয়ে যাচ্ছে, তাই এই নিবন্ধটি সংরক্ষণ খুবই জরুরি।
আরও অনেক খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ বলেছেন, যদি এই প্রবন্ধটি পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের বিশেষ নানা দিক জানার সুযোগ পাবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও দেশের প্রখ্যাত রাষ্ট্রদূত অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, আমি এই নিবন্ধটি পড়েছি। এটি অত্যন্ত তথ্যসমৃদ্ধ ও স্পষ্ট। তাই বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট যেকোনো বিষয় পড়ানোর জন্য এটি যোগ্য বলে মনে করি।
ঠাকুরগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ইসরাফিল বলেন, ‘নিবন্ধটি প্রকাশের পর মুক্তিযুদ্ধের শুরু থেকে এই ইতিহাসের পটভূমি সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে। এতে ধর্ম, বর্ণ বা জাতি নির্বিশেষে নতুন প্রজন্মের জন্য এই ইতিহাস জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি দখলদার সেনারা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করে। সে সময় তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা মেজর জিয়াউর রহমান বন্দরনগরী চট্টগ্রামে তাঁর অধীনস্থ বাঙালি সেনাদের সংগঠিত করে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তিনি তখন অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের দ্বিতীয় ইন-কম্যান্ড ছিলেন। যখন ‘একটি জাতির জন্ম’ শীর্ষক নিবন্ধটি প্রকাশিত হয়, তিনি তখন সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান হিসেবে কাজ করছিলেন, তার রैंक ছিল মেজর জেনারেল। ১৯৭১ সালে তিনি একজন অভিজ্ঞ অভ্যুত্থানকারী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে এই পদে উন্নীত হন।
২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস। এই দিনটি তিনি তার স্মৃতিচারণমূলক নিবন্ধে ‘বাঙালির হৃদয়ে রক্তাক্ষরে লেখা দিন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি লেখেন, ‘স্মৃতি হাতড়ে দেখেছি, আমি সেনাদের ডেকেছিলাম, তাদের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়েছি। সবাই সাড়া দিয়েছিল এবং সংগ্রামের জন্য প্রস্তুতি নিল।
জিয়া এই দিনটিকে ‘তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধের মূল সূচনার দিন’ Ab বলেছেন। তিনি উল্লেখ করেন, কেন বাঙালিরা এই সংগ্রামে নেমেছিল, তার ইতিহাস ও পটভূমি। তিনি মুক্তিযুদ্ধের প্রথম সময়ের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাও বিস্তারিত ব্যাখ্যা করেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, পাকিস্তানের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া অসহযোগ আন্দোলন এবং বাংলাদেশ মুক্তির জন্য সেই সময়কার উত্তেজনা সবকিছু এই নিবন্ধে অন্তর্ভুক্ত। ১৯৭১ এর ভয়াবহ রাতের বিভীষিকা, যেখানে ঢাকা ও অন্যান্য শহরে নিরীহ বাঙালিদের উপর পাকিস্তানি সেনারা নৃশংসতা চালায়, তা বর্ণনা করে তিনি লেখেন, এই রাতে অনুভূত হয় মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়।
মুক্তিযুদ্ধে জিয়া প্রথমে বিভিন্ন সেক্টরে কমান্ডার ছিলেন, পরে তিনি ‘জেড ফোর্স’ আকারে একটি বাহিনী গঠন করেন। এরপর তিনি সামরিক অভিযানে নেতৃত্ব দেন, যা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
পরবর্তীতে জনগণের মতামত ও সেনাবাহিনী চালিয়ে রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি বাংলাদেশে নতুন আধুনিক জাতীয়তাবাদ ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি বহুদলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তন করেন, বাকশাল শাসন বাতিল করেন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেন। এর ফলে দেশটি নানা ধরনের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সমন্বয়ে সফলভাবে এগিয়ে যেতে শুরু করে।

