তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানিয়েছেন, বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় দেশের ৬৫ শতাংশ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) দ্বারা নির্ধারিত বিদ্যুৎ মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্তের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। তবে এর ফলে এখনও সরকারের পক্ষে বিদ্যুৎ খাতে বিশাল অঙ্কের, অর্থাৎ ৪১ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি প্রদান করতে হচ্ছে। এই পরিস্থিতি দেশের জ্বালানি ও অর্থনীতির জন্য বড় একটি চ্যালেঞ্জ বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আজ শনিবার সকালে সচিবালয়ে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে এক জরুরি প্রেস ব্রিফিংয়ে ট্যাবলু করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী ৬৫ শতাংশ সাধারণ ও নিম্নআয়ের শ্রেণির, যারা এই মূল্যবৃদ্ধির চাপ থেকে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত। এর আগে এই গ্রাহকরা বিইআরসির সিদ্ধান্তের আওতায় ছিলেন।
তথ্যমন্ত্রী জানান, ‘বিইআরসি একটি জুডিশিয়াল বা অর্ধবিচারিক সংস্থা। তারা নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে নির্ধারিত রুটিন কাজ হিসেবে মূল্য সমন্বয় করে থাকে। তবে সরকারের লক্ষ্য প্রান্তিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, ফলে এই মূল্যবৃদ্ধি বিত্তবান গ্রাহকদের উপর কিছুটা চাপ ফেললেও ৬৫ শতাংশ সাধারণ মানুষ এই বৃদ্ধির প্রভাব থেকে নিরাপদ থাকবেন।’
আলোচনা করেন তিনি আরও বললেন, সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে জ্বালানিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন ও মূল্য সহনীয় পর্যায়ে রাখতে। পাশাপাশি, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও দ্রতগতির সাথে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
বিশেষ করে কালো টাকা ও অর্থপাচারের বিষয়েও তিনি উল্লেখ করেন, এই অপরাধের ফলস্বরূপ সরকারের ওপর বহন করতে হচ্ছে বিশাল অঙ্কের ভর্তুকি। তিনি বলেন, দেশের খেলাপি ঋণ, মানি লন্ডারিং ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপের কারণে এই অপচয় হয়। এই অপরাধের মালিকারা দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে অর্থ পাচার ও কালো টাকা সঞ্চয় করছেন, যা বর্তমান সংকটের বিশাল কারণ। এইসব অপরাধের বোঝা এখন সরকারের সংগ্রামে এসে দাঁড়িয়েছে।
ব্রিফিংয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের লিখিত বক্তব্য ও পরিস্থিতির বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী এর পরিষদীয় উপদেষ্টা ডা. জাহিদ উর রাহমান।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন তথ্য অধিদপ্তরের উপপ্রধান তথ্য অফিসার মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, এই সময়ে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশসহ অন্যান্য আমদানিনির্ভর দেশের জ্বালানি ব্যবস্থা বড় সংকটের মধ্যে রয়েছে। তিনি বলেন, ‘যদি সদৃঢ়ভাবে প্রাকৃতিক জ্বালানি সম্পদ উত্তোলনের নীতিমালা এতদিন থাকত, তাহলে দেশের ওপর এই ভয়ংকর পরিস্থিতির প্রভাব কমত। কিন্তু আগের নীতিমালার ভুলের কারণেই আজ আমরা এতটা নির্ভরশীল ও সংকটে পড়েছি। এখন বিশ্ববাজারের মান ও বাধ্যবাধকতা অনুসারে মূল্য নির্ধারণে বাধ্য হচ্ছি।’
আওয়ামী লীগ সরকারের প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী উল্লেখ করেন, ‘গত এক থেকে দেড় দশক ধরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে যে দুর্নীতি ও লুটপাটের অব্যাহত চক্র তৈরি হয়েছে, তা খুবই উদ্বেগজনক। এই দুর্নীতি থেকে খাতকে মুক্ত ও স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে সময় লাগবে, কিন্তু সরকারের সংকল্প অত্যন্ত দৃঢ়।’
তিনি আরও বলেন, আনুষ্ঠানিক ও জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনের পরিবর্তে, জনগণের স্বার্থে সরকার, গণমাধ্যম ও সাধারণ জনগণের মধ্যে স্বাভাবিক ও নিয়মিত তথ্য বিনিময় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চান। তিনি বলেন, ‘সরকারের কাজ ও সিদ্ধান্তের ব্যাপারে জনগণকে জানাতে চাই, আর জনগণও সচেতন হতে চায়। এজন্য একটি সুন্দর ও স্বাভাবিক গণমাধ্যম পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাই, যেখানে জরুরি খবর ও সিদ্ধান্ত দ্রুত প্রচার হবে এবং মতামত নেওয়া হবে।’
জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধিতে গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রশংসা করে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, বর্তমান সরকারের প্রতিটি উদ্যোগের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য আমরা দায়িত্বে আছি। তিনি আরও বলেন, সরকারের সঙ্গে জনগণের সরাসরি তথ্য বিনিময় ও সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বাস্তবসম্মত ও নিয়মিত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চান, যাতে সকল বিষয় দ্রুত ও স্পষ্টভাবে জনগণের কাছে পৌঁছে যায়।
