বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ডাঃ শফিকুর রহমান খুলনার সার্কিট হাউজ ময়দানে সমবেত জনসমক্ষে বলেন, লোক ভোটে প্রকাশিত গণভোটের রায় ও জুলাই সনদের পুরোপুরি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। সংসদে এ বিষয়গুলোর সমাধান না হলে তারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে জনগণের কাছে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরবে।
তিনি বলেন, যেখানে স্পিকারের অনুমতি ছাড়া কথা বলা যায় সেখানে তারা সরাসরি মাঠে নেমে জনগণের সঙ্গে সংলাপ করবে এবং জাতীয়ভাবে গণজাগরণ সৃষ্টি করতে উদ্যোগী হবে। যুবসমাজের উদ্দেশ্যে তিনি আরও বলেন, “জুলাই আন্দোলনের মাধ্যমে আপনারা ফ্যাসিবাদকে বিদায় জানিয়েছিলেন। এখন প্রয়োজন হলে নব্য ফ্যাসিবাদকে বিদায় জানানোর জন্য আরেকটি অনিবার্য বিপ্লবের প্রস্তুতি রাখতে হবে।” তিনি আরও জোর দিয়ে বলেছেন যে এই প্রস্তুতি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি, পরিবার বা গোষ্ঠীকে ক্ষমতায় বসানোর লক্ষ্যে নয়, বরঞ্চ একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে।
শনিবার বিকালে খুলনার ঐতিহাসিক সার্কিট হাউজ ময়দানে ১১ দলীয় ঐক্যের বিভাগীয় সমাবেশে জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় নেতারা ও সহযোগী জোটের রাজনৈতিক নেতারা অংশ নেন। সমাবেশের সভাপতিত্ব করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সভাপতি কর্নেল (অবঃ) ড. অলি আহমদ বীর বিক্রম ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক।
অন্যান্যের মধ্যে ছিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী, নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম সোবহানী, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডাঃ মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নেতারা মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন ও মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, আমার বাংলাদেশ পার্টির যুগ্ম-সচিব এড. আব্দুল্লাহ আল মামুন রানা, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এড. এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন প্রমুখ। সমাবেশ বাস্তবায়ন কমিটির আহবায়ক হিসেবে ছিলেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য মোবারক হোসাইন।
অন্যান্য আলোচিত বক্তাদের মধ্যে ছিলেন খুলনা মহানগরী আমীর মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান, জেলা আমীর মাওলানা এমরান হুসাইন, সাতক্ষীরা জেলা আমীর শহীদুল ইসলাম মুকুল, বাগেরহাট জেলা আমীর মাওলানা রেজাউল করিম, ঝিনাইদহ জেলা আমীর আলী আজম, যশোর জেলা আমীর অধ্যাপক মোঃ গোলাম রসূল, মেহেরপুর জেলা আমীর মাওলানা তাজ উদ্দিন খান, নড়াইল জেলা আমীর মোঃ আতাউর রহমান বাচ্চু এবং আরও অনেকে। সমাবেশ কোরআন তেলাওয়াত ও কুতুবীয়ার সম্মানসূচক উপস্থাপনার মাধ্যমে শুরু হয়। পূর্বাহ্নে প্রেরণা সাহিত্য সংস্কৃতি সংসদের আয়োজনে স্থানীয় শিল্পীরা বাইনা ও ধর্মীয় গানে অংশ নেন।
ডাঃ শফিকুর রহমান সমাবেশে আরো অভিযোগ করেন যে অতীতে সরকারের দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা হয়েছে এবং রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে দলীয়করণ করে জনগণের অধিকার ক্ষুণœ করা হয়েছে। তিনি বলেন, তাদের আন্দোলন কোনো বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে নয়; বরং অন্যায়, দখলদারিত্ব, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে গতিশীল প্রতিরোধ গঠনের লক্ষ্যে। তিনি একদিকে দেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা রক্ষায় জনগণ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান এবং অন্যদিকে কোনো বৈদেশিক আধিপত্য মেনে নেবেন না বলে কর্মসূচি শক্ত করেন।
সমাবেশে বক্তারা সরকারের প্রতি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জনদুর্ভোগ নিরসন এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের দাবি জানান। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচনের আগে যে রাষ্ট্রসংস্কার ও ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল, ক্ষমতায় এসে সরকার তা থেকে সরে এসেছে; ফলে জনগণের রায় অবজ্ঞা করা হচ্ছে এবং দেশ কর্তৃত্ববাদী প্রবণতার দিকে ধাবিত হচ্ছে।
অংশগ্রহণ ও আয়োজনের বিবরণে উল্লেখ করা হয়, খুলনা বিভাগের ১০টি জেলা থেকে প্রায় পাঁচ হাজারেরও বেশি লোক বাস, ট্রাক, ট্রেন ও নৌযানযোগে করে সমাবেশে এসেছে। সকাল থেকেই শহরে মিছিল, স্লোগান ও ব্যানারে ভরে ওঠে পরিবেশ। মঞ্চ নির্মাণ, অতিথি আসন, মাইক্রোফোন ও অন্যান্য লজিস্টিক রাতেই শেষ করা হয়। সার্কিট হাউজ ময়দানে বড় ব্যানার, লাল কার্পেট ও অস্থায়ী ছাউনি সরবরাহ করা হয়েছিল।
উপস্থিত নেতারা জানান, এই বিভাগীয় সমাবেশ খুলনার রাজনীতিতে নতুন উজ্জ্বলতা যোগ করেছে। জাতীয় নির্বাচনের পর বিরোধী জোটের দিকনির্দেশনা, সরকারের নীতির প্রতি সমালোচনা ও ভবিষ্যৎ কর্মসূচি নির্ধারণের জন্য এ সমাবেশ গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হিসেবে কাজ করেছে। জোটের নেতৃত্ব বলেছে, জনগণের রায় বাস্তবায়ন না হলে তারা আরও বৃহত্তর কর্মসূচি ও মাঠ অভিযানের পরিকল্পনা করবে।
সমাবেশ সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর পরিবেশে শেষ হয়; জামায়াতের নেতারা সফল আয়োজনে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং দেশের সর্বস্তরের মানুষকে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।