প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তিন দিনের দ্বিপাক্ষিক সফরে চীনে রয়েছেন—দায়িত্ব গ্রহণের পর তার প্রথম বিদেশ সফরের দ্বিতীয় গন্তব্য হলো বেইজিং। এই সফর কূটনৈতিক ও ব্যবসা-ক্ষেত্রে ব্যাপক উৎসাহ ও কৌতুহল তৈরি করেছে। সরকারি ও কূটনৈতিক সূত্রে ধারণা, শিল্পখাত ও মেগা অবকাঠামোসহ বহুমাত্রিক সহযোগিতার লক্ষ্যে এই সফরে ১৫টিরও বেশি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হতে পারে।
চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমস জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী আগামী শুক্রবার পর্যন্ত চীনেই থাকবেন। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলোও সফরটি নিয়ে আশাবাদী এবং আশার ভিত্তি হিসেবে বড় ও মাঝারি পর্যায়ের প্রজেক্ট, বিনিয়োগ ও শিল্পকেন্দ্রিক যৌথ উদ্যোগকে দেখছে।
চীন ও বাংলাদেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই বন্ধুত্বপূর্ণ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ওপর গড়ে উঠেছে। কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে দুই দেশের যোগাযোগ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পাঁচ নীতির সুতোয় বাঁধা। ২০২৪ সালে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ‘সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতা অংশীদারত্বে’ উন্নীত করা হয়েছে। অর্থনীতিতে দীর্ঘ দুই ও ত্রিশ-র ঠিক বেশি নয়—কিন্তু চলতি ১৫ বছর ধরে চীন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে রয়ে গেছে। চীন কিছু রপ্তানিপণ্যকে শূন্য শুল্ক সুবিধাও দিয়েছে, যা বাংলাদেশের রপ্তানিকে সুবিধা দিয়েছে।
অবকাঠামো নির্মাণেও চীনের সহায়তা চোখে পড়ার মতো; পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্পগুলো দেশের যোগাযোগ ও পরিবহন ব্যবস্থায় দৃশ্যমান সুবিধা দিয়েছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ ও অন্যান্য সহযোগিতামূলক প্রকল্প আঞ্চলিক সংযোগ ও অবকাঠামো গড়তে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। পাশাপাশি দুই দেশ রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা ও আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করছে।
তবুও সম্পর্ককে আরও গভীর ও টেকসই করতে কিছু চ্যালেঞ্জ আছে। প্রথমত, ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা ও তৃতীয় পক্ষের রাজনৈতিক প্রভাব। কিছু পরাশক্তি বাংলাদেশকে নির্দিষ্ট নিরাপত্তা ও উন্নয়ন কাঠামোর মধ্যে টানার চেষ্টা করছে—এ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি। তৃতীয়ত, অর্থনীতি ও কূটনীতির বিষয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য—দলের, সিদ্ধান্তগ্রহণকারীর ও বাণিজ্যিক মহলের মাঝে চীনের প্রতি ভিন্ন রকম অভিমত রয়েছে।
আরও একটি বাস্তব সমস্যা হলো বাণিজ্য ভারসাম্য ও কাঠামোগত সক্ষমতা। দেশের কিছু আলোচনায় স্থানীয় শিল্পের সীমিত বৈচিত্র্য ও যোগ্যতা সম্পর্কে কম মনোযোগ দিয়ে চীনা পণ্যের প্রবেশকেই দায়ী করা হয়। পাশাপাশি চীনের সঙ্গে অগ্রগতিকে ‘ঋণের ফাঁদ’ বা অনিশ্চিত চুক্তি বলে উপস্থাপন করার প্রবণতাও সম্পর্ককে জটিল করে তোলে।
এইসব বাধা অতিক্রম করা মোটেই অসম্ভব নয়। সরল ও খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে পারস্পরিক দৃষ্টিভঙ্গির ফারাক কমানো, নীতিগত স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ মনোভাব সাহসীকতার সঙ্গে পালনের উৎসাহ রাখলে দেশের প্রকৃত স্বার্থ আরো নিশ্চিত করা সম্ভব।
সফরের সম্ভাব্য ফলাফলগুলোতে শিল্পখাতে যৌথ বিনিয়োগ বাড়ানো, উচ্চমূল্যের পণ্যে উৎপাদনশিলতা বাড়িয়ে রপ্তানি সক্ষমতা উন্নয়ন এবং চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে উৎপাদন কেন্দ্র গঠনে উদ্বুদ্ধ করা রয়েছে। এছাড়া গ্লোবাল সাউথ ও আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদার হওয়ায় বাংলাদেশ এশিয়ার শিল্প শৃঙ্খলে আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতে পারবে। চীন-দক্ষিণ এশিয়া এক্সপো ও ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতামূলক প্ল্যাটফর্মগুলো এই সংযোগকে আরও মজবুত করবে।
অবশেষে, সুশাসন ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাপনায় অভিজ্ঞতা বিনিময় বাড়ালে বাংলাদেশ নিজস্ব বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে উন্নয়ন নীতি গ্রহন করতে পারবে। রাজনৈতিক দল, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় ব্যবস্থাপনার মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ জোরদার করা যেতে পারে। কোন একক উন্নয়ন মডেল অনুসরণ না করে পূর্ব-পশ্চিমের অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে বাংলাদেশ তার নিজস্ব আধুনিকায়নের পথ খুঁজে নিতে সক্ষম।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যত কী রূপ নেবে, তা নির্ভর করবে দুই পক্ষের দূরদর্শিতা, যোগাযোগের স্বচ্ছতা ও বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়ার ওপর।