দেশে নিবিড় পরিচর্যা (আইসিইউ) সেবায় তীব্র সংকট চলছে—এমন चेतা তুলে ধরেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের সহসভাপতি ডা. জুবাইদা রহমান। রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বুধবার (১ জুলাই) বাংলাদেশ সোসাইটি অব ক্রিটিক্যাল কেয়ার মেডিসিনের জাতীয় সম্মেলন-২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বর্তমানে প্রতি এক লাখ মানুষকে মাত্র ১.৭টি ক্রিটিক্যাল কেয়ার শয্যা পাওয়া যাচ্ছে এবং সাধারণ হাসপাতালের শয্যা মাত্র ৯টি। ৬৪ জেলার মধ্যে ৩৮ জেলায় কোনো আইসিইউ নেই এবং দেশের মোট ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিটের ৮০–৯০ শতাংশই ঢাকাকেন্দ্রিক।
তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, দেশের ৬৮ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষ গ্রামে থাকে, কিন্তু সেবা বড় শহরকেন্দ্রিক হওয়ায় প্রত্যন্ত এলাকার রোগীরা সময়মতো জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা পান না। নবজাতক, গর্ভবতী মা, নিউমোনিয়া বা স্ট্রোকে আক্রান্ত বয়স্ক মানুষ এবং সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতরভাবে আহত রোগীরা জেলা বা গ্রাম পর্যায়ে দরকারি আইসিইউ সেবা না পাই রোগ নিরুপায় থেকে যাচ্ছেন—অনেকে প্রাণ হারাচ্ছেন।
জরুরি শয্যা না থাকার পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক—বিশেষ করে অ্যনেস্থেসিওলজিস্ট, কার্ডিওলজিস্ট ও নিউরোলজিস্ট—দক্ষ নার্স এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রীরও তীব্র ঘাটতি আছে, বলেন তিনি। তাই কেবল শয্যা বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; পরিকল্পিত বিনিয়োগ, লোকশক্তি গঠন ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন।
প্রত্যন্ত এলাকায় দ্রুত আইসিইউ বসানো সবসময় সম্ভব না হলেও আধুনিক জীবনরক্ষাকারী সুবিধা সম্বলিত অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে সংকটাপন্ন রোগীদের দ্রুত জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া গেলে মূল্যবান সময় বাঁচবে—এমন বিকল্পও তিনি উল্লেখ করেন। তার পরামর্শ, প্রতিটি জেলা সদর হাসপাতালে পূর্ণাঙ্গ ক্রিটিক্যাল কেয়ার ইউনিট গড়ে তোলা জরুরি।
সংকটের মধ্যেও দেশের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সীমিত সুযোগ-সুবিধায় নিরলসভাবে রোগী সেবা করে যাচ্ছেন—এ点ের প্রশংসা করেন ডা. জুবাইদা। তিনি বলেন, সমন্বিত উদ্যোগ ও সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ নিলে দেশের প্রতিটি মানুষের কাছে নিবিড় পরিচর্যার সেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
বিশেষ অতিথি সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেন বলেন, পুরোনো মেডিকেল কলেজগুলোতে দ্রুত ক্রিটিক্যাল কেয়ার বিষয়ে প্রশিক্ষণ ও কোর্স চালু করতে হবে। অ্যানেস্থেসিওলজি আর ক্রিটিক্যাল কেয়ার একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়—বরং পরিপূরক; তাই সব বিভাগের সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সরকারের ক্ষেত্রে বিষয়টি বোঝা রয়েছে ও ইতোমধ্যে ১০টি জেলায় নতুন আইসিইউ চালু করা হয়েছে; ধাপে ধাপে আরও ইউনিট স্থাপন করা হবে। তবে তিনি নির্দেশ দেন যে, বড় বাজেট দেওয়ার পাশাপাশি জবাবদিহি ও পেশাগত নৈতিকতা নিশ্চিত করতে হবে, আর আইসিইউ স্থাপনের সঙ্গে এর কার্যকর ব্যবস্থাপনা ও রোগীর সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা চিকিৎসকদের অন্যতম দায়িত্ব।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যসচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. এফ এম সিদ্দিকী, বিএসসিসিএমের সভাপতি অধ্যাপক ডা. আরিফ আহসান, সাধারণ সম্পাদক ডা. মো. জাফর ইকবাল, ড্যাব সভাপতি অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশিদ, মহাসচিব ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস ও অন্যান্য সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে উত্থাপিত এসব তথ্য ও অনুরোধ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে গ্রামীণ মানুষের কাছে নাগাল বাড়বে এবং অপ্রয়োজনে প্রাণহানি কমবে—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়।