নির্বাচন কমিশন (ইসি) অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের মার্চের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা নির্বাচনের কার্যক্রম সম্পন্ন করতে চায়। এরপর তারা সিটি কর্পোরেশনগুলোর নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা করেছে। জানা গেছে, এই নির্বাচনের ধাপগুলো অঞ্চলভেদে বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত হতে পারে, এবং এর মধ্যে সময়ের ব্যবধান বাড়ানোর চিন্তাভাবনা রয়েছে। নির্দেশিকা অনুযায়ী, জোড়ানো সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য যাতায়াত ব্যবস্থা, আবহাওয়া পরিস্থিতি ও একাডেমিক ক্যালেন্ডারও বিবেচনা করা হবে। এই সংক্রান্ত প্রতিবেদন তৈরি করেছেন ইসির নির্বাচন শাখার উপ-সচিব মোঃ মনির হোসেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাওর, উত্তর-পূর্বাঞ্চল (সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ, হবিগঞ্জের অংশ) অঞ্চলে সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বরের মধ্যে পানি স্তর ওঠায় নৌকায় যাতায়াতের সুবিধা থাকবে। পার্বত্য ও উপকূলীয় এলাকার (রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, কক্সবাজার, উপকূলীয় দ্বীপসমূহ- হাতিয়া, সুদ্বীপ ও বরিশাল অঞ্চল) জন্য নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচন উপযোগী সময় নির্ধারণ করা হবে। নদীপ্রধান ও চরাঞ্চল (কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, সিরাজগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, শরীয়তপুর, চাঁদপুর ও রাজবাড়ীর চরাঞ্চল) ছাড়া অন্যান্য সমতল ও শহরাঞ্চলে বর্ষাকাল এর বাইরে যেকোনো সময় নির্বাচন আয়োজনের জন্য উপযুক্ত। ইসি কর্মকর্তারা বলছেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক একাডেমিক ক্যালেন্ডার, আবহাওয়া অধিদপ্তর ও শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করেই নির্বাচন সময়সূচি নির্ধারিত হবে। সাধারণত নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে ডিসেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত স্কুল-কলেজে বার্ষিক পরীক্ষা চলায় ওই সময় কয়েক দিন বিরত রাখা হতে পারে। পাশাপাশি, ২০২৭ সালের জানুয়ারি মাসে মাধ্যমিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথাও রয়েছে। হাওর ও পার্বত্য অঞ্চলের ভূগোলিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে সময় নির্ধারণ করা হবে। ইসি সচিবালয়ের তরফ থেকে প্রস্তাবনা অনুযায়ী, আগে পরিচালিত ধাপে ধাপে নির্বাচনের মধ্যে সময়ের পার্থক্য কম ছিল। এর ফলে মাঠ পর্যায়ে মনোনয়নপত্র দাখিল, যাচাই-বাছাই, আপিল, প্রতীক বরাদ্দ, ভোটগ্রহণ ও প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য কার্যক্রমে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হতো, কারণ সময়ের অমিলের কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় দ্রুত মোতায়েন করতে পারত না। তাই এই বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে ধাপগুলোর মধ্যেকার সময় ব্যবধান নির্ধারণ করা হবে। ইতোমধ্যে এই প্রস্তাবনা নিয়ে নির্বাচন কমিশনের বৈঠক হয়েছে, যেখানে ইউপি নির্বাচন আগে করার সিদ্ধান্ত নেন। আলোচনায় আলোচনা হয়, ১ অক্টোবরের মধ্যে ভোটের তফসিল ঘোষণা করতে হবে, যাতে ৪০ থেকে ৪৫ দিন আগেই নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এছাড়া, আগামী ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে যারা বয়স ১৮ বছর হবে, তাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ভোট কেন্দ্রের জন্য প্রতি ৫০০ থেকে ৬০০ ভোটারের জন্য একটি ব্যবস্থা রাখা হবে বলেও ভাবা হচ্ছে। অন্যদিকে, বেসরকারি কলেজের শিক্ষকরা যদি ভোটের অংশ নিতে চান, তাহলে আইন সংশোধনের বিষয়েও আলোচনা চলেছে। এ বিষয়ে জ্যেষ্ঠ নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, বৈঠকে সব প্রস্তুতির বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। অক্টোবরে নির্বাচন শুরু নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইউপি নির্বাচন দিয়ে শুরু হতে পারে। আর কিছু বিধিমালা সংশোধনের বিষয়ও উঠেছে, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে সুপারিশের ভিত্তিতে। জানা গেছে, দেশে মোট ৪ হাজার ১৯৫টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে। এর মধ্যে চলতি বছর ৩,৯৮১টি ইউপিতে নির্বাচন হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেছে। বাকিগুলোর জন্য সময় নির্ধারিত হবে ২০২৭ ও ২০২৮ সালে। দেশের ৩৩০টি পৌরসভার মধ্যে ৩২০টি নির্বাচন উপযোগী, আর ১০টি আইনি জটিলতার কারণে নির্বাচন করতে পারবে না। এর পাশাপাশি নতুন ৫টি উপজেলা যোগ দিয়ে মোট এখন ৫০০ উপজেলা রয়েছে, এবং সবগুলোই নির্বাচন উপযোগী। নতুনভাবে সৃষ্টি হয়েছে বগুড়ার শিবগঞ্জ, কক্সবাজারের চকরিয়া, ঠাকুরগাঁও সদর, লক্ষ্মীপুর সদর এবং রুহিয়া এবং ভুল্লী উপজেলা। এছাড়া, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন করে ১৩টি সিটি কর্পোরেশন গঠন করা হয়েছে, এর মধ্যে বগুড়া সিটি কর্পোরেশন অন্যতম। বর্তমানে এগুলোর সবগুলোই নির্বাচন উপযোগী— ইউপি বাদে অধিকাংশ স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনা প্রশাসকের মাধ্যমে চলছে। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, জেলা পরিষদ নির্বাচনে সরাসরি জনগণের ভোট নেই, তাই এর গুরুত্ব বেশ কম মনে করা হয়। তবে সরাসরি সিটি কর্পোরেশন ও অন্যান্য নির্বাচন ভবিষ্যতে আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য সরকারের প্রস্তুতি আমরা পর্যবেক্ষণে রেখেছি। তারা যখন কিছু বলবে, আমরা ৪৫ দিন আগে প্রস্তুত হয়ে যাব। একটি নির্বাচন আয়োজনের জন্য সাধারণত প্রায় ৪৫ দিন সময় দরকার এবং এখনো সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছ। তারা আমাদের সূচি অনুযায়ী প্রস্তুতি নিচ্ছেন— আমরাও তাদের সঙ্গে সমন্বয় করছি।

