চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশে কমপক্ষে ৮৬টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা সাংঘাতিক একটি পরিস্থিতির ইঙ্গিত দেয়। এর মধ্যে ৪৭ জন মেয়ে এবং ৩৬ জন ছেলে, আর তিনজনের লিঙ্গপরিচয় জানা যায়নি। শিশুরা নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘শিশুরাই সব’ এই অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনটি ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। আজ সোমবার এই প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ সাংবাদিকদের কাছে পাঠানো হয়।
প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ছয় মাসে ৩৩৬ শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে ১২৭ জন মেয়ে এবং ২৪ জন ছেলে, বাকিরা (১৮৫ জন) লিঙ্গের তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়নি। পূর্ববর্তী বছর ২০২৫ সালে সম্পূর্ণ বছরে মোট শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছিল ৩০৮ জন।
এই প্রতিবেদনে শিশুদের হত্যা, নির্যাতন ও যেকোনো ধরনের হত্যাকাণ্ডের শিকার শিশুদের ব্যাপারে আলোচনা করা হয়েছে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের তুলনায় ২০২৬ সালে শিশু হত্যার ঘটনা বেড়েছে। প্রথম ছয় মাসে গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ১৪টি শিশু প্রাণ হারিয়েছে, যেখানে ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ছিল প্রায় ১১।
প্রতিবেদনের তথ্যে দেখা যায়, নিহত শিশুর মধ্যে অধিকাংশই নারী। মোট ৮৬ শিশুর মধ্যে ৪৭ জনই মেয়ে এবং ৩৬ জন ছেলে, তিনজনের লিঙ্গ জানা যায়নি।
ভৌগোলিকভাবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বেশিরভাগ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে গ্রামে। সেখানে মূল কারণ হিসেবে রাগ, ক্রোধ, ধর্ষণ ও শারীরিক ও যৌন নির্যাতন চিহ্নিত করা হয়েছে। শহরাঞ্চলে শিশুহত্যার মূল কারণ হলো যৌন নির্যাতন, ধর্ষণ এবং দামী জিনিসের লুটপাট। সবচেয়ে বেশি শিশুহত্যা ঘটে ঢাকায়, যেখানে ২২টি ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া সিলেট ও বরিশালে ছয়টি করে ঘটনা রেকর্ড হয়েছে।
বয়স অনুযায়ী বিচার করলে, শূন্য থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝড়ের মুখে পড়ছে, এঁরা মোট ৪৬টির শিকার হয়েছে।
অপরাধীদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, অধিকাংশ শিশুহত্যা ঘটে তাদের কাছ থেকে, যারা শিশুরা পরিচিত। বাবা-মা, সৎ বাবা-সৎ মায়েরা, নিকটজনরা এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা এই জঘন্য কাজের সঙ্গে জড়িত। মোট নিহত শিশুর মধ্যে ১৭ জনের (প্রায় ৩৪.১২%) হত্যা মামলায় মা-বাবা অপরাধী, এবং ১১ জনের সঙ্গে পরিবারের অন্য সদস্যরা জড়িত। অপরাধের জন্য দায়ী মানুষদের মধ্যে প্রতিবেশী ও পরিচিত ব্যক্তি ২৫.৮৮ শতাংশ। অর্থাৎ, অর্ধেকের বেশি হত্যাকাণ্ডের জন্য সরাসরি বা পরোক্ষভাবে অন্য মানুষ দায়ী।
সংগঠনটি শিশু নির্যাতন প্রতিরোধের জন্য কিছু সুপারিশও প্রস্তাব করেছে। এর মধ্যে রয়েছে— দ্রুত, কার্যকর ও শিশু সংবেদনশীল বিচার ব্যবস্থা তৈরি, সরকারকে শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া, শিশু নির্যাতনের মামলাগুলো দ্রুত শুনানি ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। পাশাপাশি, নির্যাতিত শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, মানসিক সহায়তা, আইনি সাহায্য ও পুনর্বাসনের সংহত ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে।

