রাজধানীর উত্তরায় র্যাব-১ কার্যালয়ে ভেঙে পড়তে থাকা ‘আয়নাঘর’ নামে পরিচিত টর্চার সেল পরিদর্শন করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি ও প্রসিকিউটররা। এই ক্ষতিপূরণটি স্পষ্ট করে তোলে যে, এই ঘরগুলো কোনো কাল্পনিক জায়গা নয়, বরং বিগত সরকারের অমানবিক পৈশাচিক হত্যাযজ্ঞের ভয়াবহ চিত্র। শনিবার সকালে তিন বিচারপতি, প্রসিকিউশন টিম, ভিকটিম পরিবারের সদস্য ও মানবাধিকার কর্মীরা যৌথভাবে এই পরিদর্শন সম্পন্ন করেন। তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে বিভিন্ন কক্ষ, অবকাঠামো এবং সংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলো внимательно পর্যবেক্ষণ করেন। এই সময় বিচারক এবং প্রসিকিউশন দলের সদস্যরা বন্দিশালার স্থান, জিজ্ঞাসাবাদের কক্ষ, নজরদারির ব্যবস্থা এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় গুলো দেখেন। বিশেষ করে গুমের অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত বাস্তব চিত্র বোঝার জন্য এই পরিদর্শন করা হয়। ২১ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চীফ প্রসিকিউটর মোঃ আমিনুল ইসলাম এই পরিদর্শনের অনুমতি প্রদান করেন, যার জন্য তিনি তদন্ত সংস্থা ডিএফআই ও র্যাবের এই অন্ধকারঘরটি পরিদর্শনে সহায়তা চান। নেতৃত্বে ছিলেন বিচারপতি মোঃ গোলাম মর্তুজা মজুমদার, তাদের সঙ্গে ছিলেন আরও দুই বিচারপতি। পরে, তিনি সাংবাদিকদের জানান, তদন্তে অন্ধকারে থাকা এই ঘরগুলোতে প্রায় ২২টি কামরা রয়েছে, যেখানে ভিকটিমদের দীর্ঘদিন, মাসের পর মাস ও বছরভর অবিচার করা হতো। অমানবিক এই স্মৃতি শনাক্ত করতে গিয়ে দেখা গেছে, ঘরগুলো এতটাই সরু যে একজন স্বাভাবিক মানুষ সেখানে শোয়ার উপায় হারিয়ে ফেলবেন। তদন্তে জানা গেছে, ঘরগুলো দেয়ালের মাধ্যমে অনেকাংশে ঢেকে রাখা হয়েছিল, যাতে তথ্য গোপন করা যায়। তদন্তকারী সংস্থাগুলোর প্রথমেই দেখা যায় বিভ্রান্তি, তবে ভিকটিমের বিবরণ ও প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে নতুন করে দেয়াল উচ্ছেদের পর ভয়ঙ্কর বাস্তবতা উন্মোচন হয়। প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ও ব্যারিস্টার আরমানকেও এই সেলে আটক রাখা হয়েছিল। এখন পর্যন্ত প্রায় ২৫০ জনের বেশি গুম হওয়া ব্যক্তির সন্ধান মিলেনি। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা চলমান। চিফ প্রসিকিউটর স্পষ্ট করেছেন যে, এই নির্যাতন ও গুমের ঘটনা দমন করে রাখার জন্য প্রচুর প্রমাণ নষ্ট করা হয়েছিল। তিনি আবারো উচ্চারিত করেছেন, এই ‘আয়নাঘর’ সরাসরি দেখিয়ে দেশের মানবাধিকার লঙ্ঘনের চিত্র প্রকাশ করেছেন। এই ভরাট কক্ষগুলোতে অমানবিক নির্যাতনের প্রকৃত চিত্র দেখতে তিনি বলেন, এই পরিদর্শন একটি আইনি প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক রুল অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে। তিনি জানান, মোট ২২টি কক্ষ খুঁজে পেয়েছেন যেখানে ভিকটিমদের দীর্ঘদিন আটকে রাখা হলেও ঘরগুলো এমন সরু যে একজন স্বাভাবিক মানুষ সেখানে শোয়ার পরিস্থিতিতে নেই। তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেছে, গভীরভাবে ঘেরা এই কক্ষগুলোতে ভেতরে তথ্য গোপনের জন্য দেয়াল নকশা করা হয়েছিল। তদন্তের সময় সাবেক স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ ও ব্যারিস্টার আরমানের আটক থাকা প্রাথমিক প্রমাণ হিসেবে পাওয়া গেছে। এর পাশাপাশি জানা গেছে, গুমের শিকার প্রায় ২৫০ জনের মধ্যে বেশিরভাগের সন্ধান এখনও পাওয়া যায়নি। মানবাধিকার ও আইনি লঙ্ঘন বিষয়ে তিনি বলেন, যেখানে কাউকে গ্রেফতার করলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করতে হয়, সেখানে এই আয়নাঘরকেএ যোগ্যতাসম্পন্ন একটি মানবতাবিরোধী অপরাধ। তিনি আরও জানান, কেবল মাঠের কর্মকর্তারা নয়, যারা এই ফ্যাসিস্ট শাসনে সরাসরি জড়িত ছিলো এবং যারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সহায়তায় এই মানবতাহানির মাস্তানের মূল চালক ছিল, তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে। আগামী শনিবার, সেনানিবাসের ভিতরে ডিএফআই-র ইন্টারোগেশন সেল বা জিআইসি পরিদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, তদন্তের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং সত্য উন্মোচনে এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। এই পরিদর্শনের ভিত্তিতে একটি বিস্তারিত রিপোর্ট তৈরী করা হবে, যা আদালতের বিচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হবে।

