নিরাপদ ও সম্মানজনক বিসিএস ক্যাডারের চাকরি ত্যাগ করে আশির দশকে যখন তিনি রাজনীতির মাঠে প্রবেশ করেন, তখন তা ছিল একটুখানি আশঙ্কার গল্প। নিজেকে প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান হিসেবে প্রথমবারের মতো পরিচিতি লাভ করেন। সেই সময়ের সরল প্রকৃতি, গ্রাম্য জীবনযাত্রা এবং তৃণমূলের মানুষের প্রতি বিনয়ী সম্পর্ক তাকে জনপ্রিয় করে তোলে। দীর্ঘ দশকের নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম, শতাধিক মামলা, নানা কারাবাস এবং রাজনৈতিক সংকটে অবিচল থেকে তিনি বাংলাদেশ রাজনীতির শীর্ষে পৌঁছেছেন। গতকাল তিনি দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভিনব ঘটনা। বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে সদস্যদের ভোটে তিনি জয়ী হন এবং শুক্রবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে শপথ গ্রহণের মাধ্যমে তিনি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন। অনেকে এই দীর্ঘ পথচলাকে এক জীবন্ত মহাকাব্য হিসেবে বর্ণনা করেন—শৈশব থেকে ছাত্ররাজনীতি, শিক্ষকতা, প্রশাসনিক পদ, স্থানীয় সরকার ও কৃষক আন্দোলন—প্রতিটি অধ্যায় যেন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের একটা প্রতিফলন। ব্যক্তিগত জীবনেও তিনি বলতে গেলে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন। সরকারি বিসিএস চাকরি থেকে রাজনীতির জন্য সবাই যে ত্যাগের কথা ভাববে না, তার এক উজ্জ্বল উদাহরণ মির্জা ফখরুল। তিনি দীর্ঘ দিন ধরে সংগঠনের জন্য নিজের স্বার্থ বিসর্জন করেছেন। তার জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি, ঠাকুরগাঁওয়ের এক ঐতিহ্যবাহী ও রাজনৈতিক পরিবারে। বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন একজন প্রখ্যাত আইনজীবী ও রাজনীতিবিদ, যিনি ঠাকুরগাঁও থেকে একাধিকবার সংসদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। শৈশবে থেকেই তিনি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির খবর শুনে বড় হয়েছেন, যা তার রাজনীতি বুঝতে এবং নেতৃত্বে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে অধ্যয়নের সময় তিনি বঙ্গবন্ধুর স্বাধীকার আন্দোলনের উত্তাপে অংশ নেন। ছাত্ররাজনীতিতে তার দ্রুত সুনাম তৈরি হয়, তিনি অসংখ্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন, কারাবরেণসহ বিপর্যস্ত সময়েও নেতৃত্বের দীর্ঘশ্বাস না ফ্যালে তিনি এক দৃঢ়প্রতিজ্ঞ নেতা হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। স্বাধীনতার পর তিনি দেশের সামরিক ও সিভিল প্রশাসনে যোগদান করেন, যেখানে তার প্রজ্ঞা ও দক্ষতা ধীরে ধীরে প্রমাণিত হয়। শিক্ষকতা জীবনে তিনি ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন, শান্ত ও প্রজ্ঞাময় শিক্ষক হিসেবে ছাত্রদের মন জয় করেন। আশির দশকের শেষ ভাগে দেশ স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে যখন কঠিন সময় পার করছিল, তখন তিনি চাকরি ত্যাগ করে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। ১৯৮৮ সালে তার প্রচেষ্টায় তিনি ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এই জয়ে তিনি এলাকার মানুষের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ে তুলেন। এরপর বিশ বছর ধরে তিনি জাতীয়তাবাদী দলের নেতৃত্বে থাকেন, জেলা পর্যায় থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে দলকে সংগঠিত করেন। কৃষক আন্দোলনে তার উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে, যেখানে তিনি দেশের কৃষক সমাজের অধিকার আদায়ের জন্য দৃঢ়ভাবে লড়াই করে যাচ্ছেন। ২০০১ সালে তিনি প্রথমবারের মতো সংসদে নির্বাচিত হন, ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিপুল ভোটে জয়ী হন। এরপর তিনি কৃষি প্রতিমন্ত্রী, বেসামরিক বিমান প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। রাজনৈতিক জীবনে তিনি নানা ঝঞ্ঝাপূর্ণ পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন। ২০০৬ সালের পর দেশের রাজনীতিতে ভয়াবহ সংকট শুরু হলে, বিএনপির জন্য চাপ বেড়ে যায়। এর মাঝে তিনি দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০১১ সালে দলের গুরুত্বপূর্ণ সংকটে তিনি দলের সংগঠন ও নেতৃত্বের ভার গ্রহণ করেন এবং দীর্ঘ সাঙ্ঘাৎ মনোবল ও সংগ্রামের মাধ্যমে দলকে ধৈর্য্য ও লড়াইয়ের ধারায় রাখেন। তার এই কঠিন সংগ্রাম, নীতি ও আদর্শের প্রতি অবিচলতা তাকে দেশের প্রিয় নেতা করে তুলেছে। রাজনীতির বাইরে তিনি একজন সৌজন্যবাজ ব্যক্তি, শান্ত ও মার্জিত ভাষায় কথা বলা একজন নেতা। তার দৃষ্টিভঙ্গি, অভিজ্ঞতা ও মানবিক গুণাবলী তাকে আজকের বাংলাদেশের অন্যতম নেত тұлতায় রূপ দিয়েছে। সদ্য রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর, সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা তার ব্যক্তিত্ব ও যোগ্যতার প্রশংসা করেছেন। তারা বলেছেন, তার নেতৃত্বে দল ও দেশের প্রতি তার দায়িত্ববোধ এবং সততা অনেককে অনুপ্রাণিত করেছে। বাংলাদেশে রাজনীতির ইতিহাসে এই দীর্ঘ ও বর্ণময় পথচলার জন্য এটাই তার অন্যতম বড় সাফল্য।

