বাংলাদেশে বিএনপি সরকার শুরুর প্রথম ছয় মাসে দেশের প্রধান শিল্প কারখানাগুলোর মধ্যে অন্তত ৯৫টি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে, যার ফলে প্রায় ৬২ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতিতে সৃষ্টি করেছে গভীর উদ্বেগ। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) জানাচ্ছে, চলতি অর্থবছরে দেশের রাজস্ব ঘাটতি অকল্পনীয় পর্যায়ে পৌঁছতে পারে, যা ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে, জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশের তিনটি প্রধান শিল্পাঞ্চলে এই কারখানাগুলোর বন্ধের ফলে সরাসরিito ৬১,৮৮১ জন শ্রমিক হারিয়েছেন।
bennies
সোমবার (২৪ আগস্ট) সকালে সিপিডির উদ্যোগে ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। সংলাপে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ও এসডিজি বাস্তবায়নের নাগরিক প্ল্যাটফর্মের আহ্বায়ক ডঃ দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নতুন সরকারের কাছে দুটো বড় প্রত্যাশা ছিল—অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড় করানোর প্রত্যাশা থাকলেও বর্তমানে কিছুটা অস্বস্তি দেখা দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে কিছু কাঠামোগত সমস্যা পেয়েছে, আর বৈশ্বিক পরিস্থিতিও যখন খুব ইতিবাচক ছিল না, তখন দেশের অর্থনীতির ধারা দুর্বল অবস্থায় পড়ে। এছাড়া, দায়িত্ব নেওয়ার সময় এই অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কোনো সমন্বিত দলিল বা পরিকল্পনা তৈরি না করায় সরকারের কার্যক্রমের সঙ্গে পরিসংখ্যান ও তথ্যের সমন্বয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ডঃ দেবপ্রিয় বলেন, সংস্কার কর্মসূচিতে কোনো পরিষ্কার পরিকল্পনা দেখা যায়নি। নির্বাচনী ইশতেহারে যেমন কিছু কমিশনের কথা বলেছিল, অনেকগুলোই এখনও বাস্তবায়িত হয়নি। তিনি জানিয়েছেন, সিপিডি প্রায় ৩৬২টি সরকারের নানা প্রতিশ্রুতি ও পদক্ষেপের তালিকা তৈরি করেছে, যাতে এগুলোকে নয়টি ভাগে ভাগ করে ‘রিফর্ম ট্র্যাকার’ এর মধ্যে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
সুশাসনের ক্ষেত্রে ১০৫টি ঘটনাকে মূল্যায়ন করা হয়েছে। সরকারি এমপিদের জন্য প্লট ও গাড়ি নেওয়া না করার সিদ্ধান্ত, দ্রুত বিচার আইনের আওতায় রামিসা হত্যা মামলার নিষ্পত্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে পরিবহন ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগগুলোকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখানো হয়। অন্যদিকে, রাজনৈতিকভাবে সম্পর্কিত ব্যক্তিদের উচ্চপদে নিয়োগের বিষয়টি উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লখ করেছেন সিপিডি। মেধার ভিত্তিতে নিয়োগের বিষয়ে প্রতিশ্রুতি রাখেনি সরকার এমন ব্যয়ও তুলে ধরা হয়।
আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার নিয়ে বেশ কিছু ত্রুটি প্রমাণিত হয়েছে, বলেন ডঃ দেবপ্রিয়। তিনি বলেন, সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থান সত্ত্বেও মব ও সহিংসতা, নারী, শিশু ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা অব্যাহত আছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চলতি অর্থবছরে সরকারের মোট রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রায় ৪২ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন হলেও, বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে। তাই সরকারের বার্ষিক লক্ষ্য থেকে এ ঘাটতি প্রায় ১৯-২০ শতাংশের কাছাকাছি।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য থেকে জানা যায়, এনবিআরের কর রাজস্বের প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে ১১ দশমিক ১ শতাংশে ও মোট কর রাজস্বের প্রবৃদ্ধি ১২ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৯ শতাংশে নেমে এসেছে। পাশাপাশি, ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণের উপর নির্ভরতা বেড়ে ৪৮ শতাংশ থেকে ৫৩.৮ শতাংশে পৌঁছেছে, যেমন নিট বৈদেশিক সহায়তাও কমে ৭৭১.৪ মিলিয়ন ডলার থেকে ৭৩৪.৩ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।
শিল্প খাতের অবস্থা আরও উদ্বেগজনক, যেখানে জানুয়ারি-আগস্টের মধ্যে ৯৫টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে এবং এর ফলে ৬১,৮৮১ কর্মসংস্থান হারিয়েছে। উৎপাদন প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমে গেছে, যা দেশের শিল্প খাতের জন্য মারাত্মক বিপর্যয়। শিল্পে ধীর প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি বেসরকারি ঋণ প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪.৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে ও বিদেশি বিনিয়োগ একটি বড় ধরনের ক্ষতি দেখিয়েছে, যেখানে নিট বিনিয়োগ কমে গেছে।
মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যাসহ নানা জটিলতার কারণে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। এই সংকটের ফলে টেক্সটাইল, ইস্পাত, কাগজ ও সিরামিকসহ গ্যাস-নির্ভর শিল্পগুলো বড় প্রভাব ফেলছে। ভেতরে বিদ্যুৎ উৎপাদন সূচক দ্রুত কমতে শুরু করেছে, যেখানে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে পরিস্থিতি দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে।
মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতিও কিছুটা উন্নতি হলেও সাধারণ মানুষ এখনো পুরোপুরি স্বস্তিতে নেই। সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৩ শতাংশে এসেছে, আর খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এসেছে। মজুরি বৃদ্ধির হার যদিও ৮ দশমিক ১ থেকে ৮ দশমিক ২ শতাংশে ওঠেছে, তবে প্রকৃত মজুরি এখনও নেতিবাচকই অবস্থানে।
রপ্তানি প্রবৃদ্ধির সূচক ৩ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছলেও, আমদানি প্রবৃদ্ধি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে ৫ দশমিক ৬ থেকে বেড়ে ১৮ দশমিক ১ শতাংশে উঠেছে। রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধিও কমে ২১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এসেছে।
মাসিক গড় বিদেশে কর্মসংস্থান ৯৫,৫২১ জন থেকে কমে ৫১,২৩৫ জনে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে, বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ৬-৭ বিলিয়ন ডলার থেকে এখন ১০-১১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর সাথে পদত্যাগের হিসাবেও বড় পরিবর্তন এসেছে: চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত ১.৩ বিলিয়ন ডলার থেকে এখন ঘাটতিতে চলে গেছে, তবে ডলারের রিজার্ভ ৩০ দশমিক ১ বিলিয়ন থেকে ৩২ দশমিক ৩ বিলিয়নে বৃদ্ধি পেয়েছে।

