ন্যূনতম কর আইনকে একটি কালো আইন হিসেবে উল্লেখ করেছেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান মোঃ আবদুর রহমান খান। মঙ্গলবার রাজধানীর গুলশানে এক হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘করপোরেট কর ও ভ্যাটে সংস্কার: এনবিআর’র জন্য একটি বিচারোচিত দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ন্যূনতম করের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। এটি সত্যি যে, এটি এক ধরনের কালো আইন। করের আওতা মূলত মুনাফার ওপর নির্ভর করা উচিত, কিন্তু এর পরিবর্তে মিনিমাম কর আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে কর সংগ্রহে সমস্যা তৈরি হয়, কারণ কর নির্ধারণে ডিজিটাল ও ব্যবসায়বান্ধব ব্যবস্থা না থাকলে কর আদায় কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি যোগ করেন, বর্তমানে দেশের ব্যবসায়ীদের জন্য সহজ ও সুবিধাজনক পরিবেশ তৈরি করতে আমরা অনেক কিছু করছি, কারণ যত সহজ করে ব্যবসা করা যাবে, তত বেশি রাজস্ব সংগ্রহ সম্ভব। তিনি আরও বলেন, দেশে ট্যাক্স এরিয়ায় বিভিন্ন ছাড় এবং এক্সেম্পশন কার্যকর থাকলে, দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন ও রাজস্ব সংগ্রহে সমস্যা দেখা দেয়। ফলে করের পরিবেশে সততা ও দায়বদ্ধতা বজায় রাখতে হবে। আবদুর রহমান খান উল্লেখ করেন, দেশের মোট বাজেটের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহের জন্য আমাদের রাজস্ব ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। তিনি সতর্ক করে বলেন, আমাদের জাতীয় আয়ের বিপরীতে ঋণের পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে, যা ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। গত বছর পাকিস্তানের কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ১২ দশমিক ২ শতাংশ, আর বাংলাদেশের তা মাত্র ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। এবার তা আরও কমে দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৬ শতাংশে। এর ফলে দেশের উন্নয়ন ও সরকার পরিচালনায় বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় একটি নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে আমাদের এনবিআর tamamen ডিজিটাল করার পরিকল্পনা রয়েছে। এতে করে ভ্যাট ও কর রিটার্ন সহজে অনলাইনেই সম্পন্ন হবে। অডিটের ব্যাপারেও তিনি বলেন, এ পর্যন্ত ম্যানুয়াল পদ্ধতি চালু ছিল, তবে এখন থেকে ঝুঁকি ভিত্তিক অডিট চালু করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে অডিট নিয়মিত ও স্বচ্ছ হবে। তিনি বলেন, কর জাল ও অপ্রদর্শিত আয় নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য করদাতাদের কাছ থেকে আয়ের সঠিক তথ্য সংগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ। করের আওতা বৃদ্ধি হলে কর হার ও ভ্যাট রেট কমানো সম্ভব হবে, যা ব্যবসায়ীদের জন্য সুবিধাজনক। রিফান্ড প্রক্রিয়াও স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সংলাপে অংশ নেওয়া গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ৮২ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করেন, বর্তমানে কর হার অত্যন্ত ‘অন্যায্য’ এবং তা ব্যবসার উন্নয়নের পথে বড় বাধা। প্রায় ৭৯ শতাংশ উল্লেখ করেন যে, কর কর্মকর্তাদের জবাবদিহির অভাব তাদের জন্য বড় সমস্যা। আর ৭২ শতাংশ বলছেন, কর প্রশাসনে দুর্নীতি তাদের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা। ঢাকা ও চট্টগ্রামে পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ১২৩টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৬৫ শতাংশ ব্যবসায়ী নিয়মিত কর দাবিকে কেন্দ্র করে কর কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। অনেকের অভিযোগ, যথাযথ ব্যাখ্যা বা পূর্বাভাস ছাড়াই কর আরোপ করা হয়। ভ্যাটের বিষয়েও অংশগ্রহণকারীদের ৭৩.৫ শতাংশ তারা বলেন, জটিল ভ্যাট আইনের কারণে তাদের জন্য বেশ সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে অস্পষ্ট নীতিমালা, পর্যাপ্ত সহায়তা না পাওয়া, পণ্যের শ্রেণিবিন্যাসের জটিলতা এবং উচ্চ অনুবর্তন ব্যয়, যা ব্যবসায়ীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। সংক্ষিপ্তভাবে, জমাকৃত তথ্য ও গবেষণা প্রমাণ করে যে, দেশের করনীতি ও ব্যবস্থাকে দক্ষ ও স্বচ্ছ করার জন্য সংস্কার জরুরি, যাতে উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নির্বিঘ্নে এগিয়ে যায়।