দীর্ঘ প্রবাস জীবন শেষে দেশে ফিরবেন বলে অনেক দিন ধরেই গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে তারেক রহমানের। গত বছর ৫ আগস্ট হাসিনা সরকার পতনের পর থেকেই এই খবর প্রবলভাবে শোনা যাচ্ছিল। বিএনপির বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা একাধিকবার বলছেন, তিনি শিগগিরই দেশের মাটিতে ফিরে আসবেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে।
তবে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের খুব কাছাকাছি আসার সঙ্গে সঙ্গে তারেক রহমানের দেশে ফেরার বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত খবর পাওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে, তার মায়ের অবস্থা খুবই সংকটজনক—বেগম খালেদা জিয়া পঞ্চম দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
এর মাঝেও তারেক রহমান ফেসবুক পোস্টে উল্লেখ করেছেন, ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগ অবারিত ও একক নিয়ন্ত্রণাধীন নয়,’ যা বেশ আলোচনার ঝড় তুলেছে। কেন তিনি দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না এবং এই সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে, তা নিয়েই উঠছে নানা প্রশ্ন।
শনিবার (৩০ নভেম্বর) দিনভর রাজনৈতিক জল্পনা-কল্পনার মধ্যে বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জোর দিয়ে বলেছেন, ‘তারেক রহমানের ফেসবুক স্ট্যাটাসেই সব ব্যাখ্যা রয়েছে। এ বিষয়ে আর কিছু বলার অপেক্ষা রাখে না।’ পাশাপাশি, তারেক রহমানের ফেসবুক স্ট্যাটাসের কয়েক ঘণ্টা পর প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম ফেসবুকে জানিয়ে দেন, ‘এ বিষয়ে সরকারের কোনো বাধা বা আপত্তি নেই।’
অতীতে, অক্টোবরের প্রথমদিকে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, ‘দ্রুতই দেশে ফিরে নির্বাচনে অংশ নেবেন’। তবে, নভেম্বরের শেষের খুব কাছাকাছি আসার আগে তিনি নিজেই জানান, এই সিদ্ধান্তের নিয়ন্ত্রণ তার হাতে নয়।
বিএনপির একজন স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, ‘দলের অনেক বিষয়ের সাথে যুক্ত হয়ে তার দেশে ফেরার বিলম্ব হচ্ছে।’ তবে, ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর তিনি অবশ্যই দেশে ফিরবেন এমন আভাসও রয়েছে নেতাদের বক্তব্যে।
প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০০৭ সালে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতির অভিযোগে তিনি জেল খেটেছিলেন। ২০০৮ সালে মুক্তি পেয়ে লন্ডনে চলে যান। বিএনপির একজন প্রবীণ নেতা বলেছেন, তারেক রহমানের দেশে ফিরতে নানা ধরনের রাজনৈতিক এবং আইনি বাধা রয়েছে, যার মধ্যে অনেকটাই influence করে থাকতে পারে কিছু প্রভাবশালী দেশের আপত্তি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, তারেক রহমানের এই ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে বোঝা যায়, মূলত দেশের পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক চাপের কারণে তিনি সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘উইকিলিকসের ফাঁস হওয়া প্রতিবেদনে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তির বিষয়টি তার দেশে ফেরার পথে বড় বাধা। বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বড়ই নির্ভর করছে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের নীতির ওপর।’
অন্যদিকে, বিবিসি বাংলার এক সাক্ষাৎকারে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় মন্তব্য করেন, ‘বাংলাদেশে বড় দুটি দলের নেতৃত্ব পরিবর্তনের জন্য একটি অগণতান্ত্রিক চক্রান্ত চলমান।’ এই মন্তব্যের পাশাপাশি তারেক রহমানের দেশে ফেরার গুঞ্জন এবং ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ সম্পর্কিত আলোচনা আবারও জোরদার হয়েছে।
বিরোধী দুই পরিবারের শাসনের উদ্দেশ্যে, অনেকের কাছে ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ পরিচিত, যেখানে শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে রাজনীতি থেকে সরানোর পরিকল্পনা ছিল। তবে, মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, এই অঙ্গীকার বা পরিকল্পনা এখনো শেষ হয়নি, আর তারেক রহমানের দেশে ফেরার অনিশ্চয়তা কি ‘মাইনাস ফোর’ তে গড়াবে, সেটাই এখন সময়ই বলবে।
অন্যদিকে, কিছু নেতা ইঙ্গিত দিয়েছেন, নির্বাচনের তফসিল কার্যকর হলে কোনও পরিস্থিতিতেই তিনি দেশে ফিরে আসবেন এবং দলের নেতৃত্ব হবেন। বেগম খালেদা জিয়া অসুস্থ থাকলে, বিএনপি নির্বাচনে জিতলে, তারেক রহমানই প্রধানমন্ত্রী হবেন—এ ধারণাও দুর্বারভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।


















