এক সময়ের একাধারে তুখোড় ক্রিকেটার ও পরবর্তীতে জনপ্রিয় ইসলামি বক্তা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছিলেন ত্ব-হা আদনান। তবে এখন তিনি নিখোঁজ, এবং জনপ্রিয় এই ইসলামি বক্তার খোঁজে নানা ধরনের উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ছয় দিন ধরে ত্ব-হা আদনানের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ এবং রংপুর জেলা পুলিশ তার সন্ধানে বিভিন্ন ধাপ অতিক্রম করছে, তবে এখনও তার অবস্থান নিশ্চিত করতে পারেনি। পরিবারের অভিযোগ, নিখোঁজের পর থেকে পুলিশ এই ব্যাপারে উদাসীনতা দেখিয়েছে। এখন সামাজিক মাধ্যমে তাকে খুঁজে পাওয়ার জন্য হ্যাশট্যাগ আন্দোলন চালানো হচ্ছে এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। নিখোঁজ এই ব্যক্তির সন্ধানে উদ্বেগ প্রকাশের পাশাপাশি, সবাই জানতে চাইছেন তিনি কেমন একজন মানুষ! উজ্জ্বল সম্ভাবনাময় এই তরুণের নাম মোঃ আফছানুল আদনান ত্ব-হা। তিনি আবু ত্ব-হা মুহাম্মদ আদনান হিসেবেও পরিচিত। তার বাড়ি রংপুরে। রংপুর মহানগরীর সেন্ট্রাল রোডের আহলে হাদিস মসজিদের পাশে তার পৈত্রিক বসবাস। বিয়ের পর স্ত্রী ও সন্তানদের সঙ্গে শালবন এলাকার চেয়ারম্যার গলিতে ভাড়া করা বাসায় থাকতেন। তার দুটি স্ত্রী, প্রথম স্ত্রীর নাম আবিদা নুর এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম সাবিকুন্নাহার। প্রথম স্ত্রীর সন্তান রয়েছে, একটি তিন বছর বয়সের মেয়ে ও দেড় বছর বয়সের ছেলে। দ্বিতীয় স্ত্রী সাবিকুন্নাহার সারা মিরপুর আল ইদফান ইসলামি গার্লস মাদ্রাসার পরিচালক ও শিক্ষক। তাদের বিয়ে হয়েছিল মাত্র তিন মাস আগে। একসময় রংপুরের ক্রিকেট অঙ্গনে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন ত্ব-হা, একাধারে একটি তুখোড় ক্রিকেটার হিসেবে পরিচিত ছিলেন তিনি। কিন্তু ধর্মের প্রতি আগ্রহ বাড়ার কারণে তিনি ক্রিকেটে ব্যবস্হা দিয়ে ধর্মীয় জ্ঞানে মনোযোগী হতে থাকেন। খেলাধুলা ছাড়াই তিনি প্রাচীন ইসলামি বইগুলি পড়াশোনা করে নতুন জ্ঞান অর্জন করতেন, যার মাধ্যমে তিনি একজন ধর্মীয় বক্তা হিসেবে সারাদেশে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। তার মা আজেদা বেগম জানিয়েছেন, আদনানের হাতেখড়ি হয়েছিল রংপুর লায়ন্স স্কুল অ্যান্ড কলেজে, এরপরে তিনি রংপুর কারমাইকেল কলেজ থেকে অনার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। মাস্টার্সে দর্শন বিষয়ের উপর ফলাফলও উত্তীর্ণ হন তিনি। এরপর বাড়ির কাছের আল জামেয়া আসসালাফিয়া মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন। অনলাইনে আরবি পড়ানো এবং বিভিন্ন মসজিদে জুমার খুতবা দেয়ার মাধ্যমে তিনি দেশের ধর্মীয় জীবনে নিজেদের স্থান তৈরি করেন। তার সোশ্যাল মিডিয়া পেজের অনুসারীর সংখ্যা প্রায় ৫২ হাজার, যেখানে তিনি ইসলামের ব্যাখ্যামূলক বক্তব্য উপস্থাপন করেন। ইউটিউবে তার কয়েকটি বক্তব্য ব্যাপক ভাইরাল হয়েছে, যেখানে তিনি কখনোই উগ্রবাদ বা সাম্প্রদায়িক উসকানি দেননি বলে তার পরিবার দাবি করে। তিনি কোনো সময় উগ্রবাদকে সমর্থন করেননি বলে তার পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়। তবে তার ধর্মীয় মতাদর্শ নিয়ে এক শ্রেণির আলেমদের সঙ্গে মতবিরোধ রয়েছে, বলে জানানো হয়। সামাজিক মাধ্যমে তার জনপ্রিয়তা দ্রুত বেড়ে যায়, তার ওয়াজের ভিডিওগুলো ব্যাপক প্রশংসিত। তিনি প্রচলিত ওয়াজের ধরণ থেকে ভিন্নভাবে কথা বলেন; স্মার্ট, স্পষ্ট ভাষায়, উচ্চমানের বাংলায় তাঁর বক্তৃতাগুলি উপস্থাপন করেন, যেখানে পবিত্র কোরআন ও হাদিসের দলিল দিয়ে প্রতিটি বক্তব্য সমৃদ্ধ। গত বৃহস্পতিবার, ঢাকার একটি মসজিদে খুতবা দেওয়ার জন্য রংপুর থেকে তিনি ভাড়া করে নিয়ে আসা গাড়িতে ঢাকা যাচ্ছিলেন। সঙ্গে ছিলেন তার দুই সহযাত্রী আবদুল মুহিত ও ফিরোজ, এবং গাড়ির চালক আমির উদ্দিন ফয়েজ। রংপুর থেকে বের হওয়ার পরই আর তাকে সন্ধান পাওয়া যায়নি। বৃহস্পতিবার রাতে, রাত ২টা ৩৬ মিনিটে তার স্ত্রী তার সঙ্গে শেষ কথা বলেন। ঐ সময়ে তিনি গাবতলীতে পৌঁছে থাকেন বলে জানান, এরপর থেকে তার মোবাইল বন্ধ। পুলিশ জানায়, গুগল ম্যাপ অনুযায়ী, তার বাসা থেকে গাড়ি চলতি পথে মাত্র ১৮ মিনিটের দূরত্বে, তবে কিছুক্ষণ পর থেকেই তার ফোন বন্ধ রয়েছে, তিনি নিখোঁজ। সবাই এখন তার সুরক্ষার জন্য আশঙ্কায় আছেন, এবং খোঁজ চালিয়ে যাচ্ছেন।