গত নভেম্বরের এক দিন পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলা বাহাওয়ালপুরে ঘটে এক চরম মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা। সেই দিন পাঞ্জাব পুলিশে ক্রাইম কন্ট্রোল ডিপার্টমেন্ট (সিসিডি)-এর একটি সশস্ত্র দল বাড়িতে প্রবেশ করে ধরপাকড় চালায়। তারা জুবাইদা বিবি ও তার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মোবাইল ফোন, ঘরে থাকা নগদ অর্থ ও অলঙ্কার লুট করে নেয় এবং ধরিয়ে নিয়ে যায় তার তিন ছেলে ও দুই জামাতাকে।
ঘটনার মাত্র ঘণ্টা খানেকের মধ্যে পাঞ্জাবের বিভিন্ন জেলা থেকে উদ্ধার হয় মোট পাঁচজনের লাশ। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে তিন ছেলে—ইমরান (২৫), ইরফান (২৩) এবং আদনান (১৮)— রয়েছেন। এই ঘটনার বিস্তারিত ছবি ভারতের আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অব পাকিস্তান (এইচআরসিপি)-এর নথিতে উঠে এসেছে। এইচআরসিপিকে জুবাইদা বিবি বলেন, “তাদের ঝড়ের মতো বাহাওয়ালপুরে ঢুকে আমাদের বাড়িতে প্রবেশ করে সব Some মূল্যবান জিনিস লুট করে নিয়ে যায়।”
তিনি আরও বলেন, “আমাদের ছেলে-জামাতাদের ফিরিয়ে পাওয়ার জন্য আমরা লাহোর পর্যন্ত গিয়ে চেষ্টা করেছি, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছি। পরবর্তীতে তাদের লাশ উদ্ধার করে আমরা জানতে পারি, তারা হত্যা করা হয়েছে।” এই ঘটনার বিচার চেয়ে জুবাইদা বিবি ও তার স্বামী আবদুল জব্বার আদালতেও গিয়েছিলেন। কিন্তু পাঞ্জাব পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের হুমকি দেওয়া হয়, যদি অভিযোগ প্রত্যাহার না করেন, তাহলে পরিবারের সবাইকেই হত্যা করা হবে। এই ভয়াবহ হুমকির মুখে বাধ্য হয়েই অভিযোগ প্রত্যাহার করেন তারা।
আবদুল জব্বার বলেন, “আমরা তাদের অপরাধী বলছি না। তারা খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ ছিল, বিবাহিত এবং সন্তানের পিতা-মাতা।” গত ১৭ ফেব্রুয়ারি এইচআরসিপি এই ঘটনা নিয়ে একটি বিশ্লেষণমূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে মাত্র ৮ মাসে পাঞ্জাবের সিসিডি ৬৭০টি ‘এনকাউন্টার’ অভিযান পরিচালনা করে, যার نتیجے ৯২৪ জন নিহত হয়েছেন।
পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী মরিয়ম নওয়াজের নেতৃত্বে ২০২৫ সালে গঠন করা হয় এই বিভাগ। মূল উদ্দেশ্য ছিল গুরুতর অপরাধ ও সংঘবদ্ধ গ্যাংদের দমন। তিনি এক ভাষণে ঘোষণা করেন, “আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে পাঞ্জাবকে অপরাধমুক্ত করার জন্য আমরা কঠোর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। সিসিডি একটি প্রশিক্ষিত বাহিনী, যারা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে কঠিন অপরাধীদের ধরতে সক্ষম।”
সিসিডির কার্যক্রম কেবল পাঞ্জাবের ভেতর সীমিত। এই বাহিনী অলিখিতভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এইচআরসিপি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বাহিনী ‘সমান্তরাল পুলিশ’ হিসেবে কাজ করছে এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রবণতা দিন দিন বেড়ে চলেছে।
পাকিস্তানে ক্ষমতাসীন জোটের অন্তর্গত পাকিস্তান মুসলিম লীগের অবদান আর রাজনৈতিক যোগসূত্রের কথাও উল্লেখ করা হয়। মরিয়ম নওয়াজ, যারা পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজের নেত্রী এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের চাচী, তারাও এই সিসিডির গুড পারফরম্যান্সের জন্য ইতিবাচক মন্তব্য করেছেন।
তবে, এইচআরসিপির অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সিসিডি ‘সমান্তরাল পুলিশ’ হিসেবে কাজ করে আসছে এবং অলিখিত দায়মুক্তি সুবিধা নিয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধির প্রবণতা প্রবল হয়ে পড়েছে। এর পরিচালক ফারাহ জিয়া আলজাজিরাকে বলেন, “১৯৬০ সালের পর থেকেই পাঞ্জাবের আইনশৃঙ্খলার নামে হত্যা বেড়ে চলেছে। তবে বর্তমানে এই প্রবণতা অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। ২০২৪ সালে জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত পাঞ্জাব ও সিন্ধু মিলিয়ে ৩৪১টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা রেকর্ড করা হয়। কিন্তু ২০২৫ সালে মাত্র আট মাসে পাঞ্জাবেই নিহতের সংখ্যা ছাড়িয়ে গেছে ৯২৪। এটি খুবই উদ্বেগজনক পরিস্থিতি।”

