খুলনা অঞ্চলের বেশ কিছু ইজারা দেওয়া ও বেসরকারি পাটকলের কার্যক্রম স্থগিত হয়ে পড়েছে কাঁচা পাটের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির কারণে। শেষ কয়েক সপ্তাহে কাঁচা পাটের দাম হঠাৎ করে দ্বিগুণের বেশি বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ অনেকটাই বেড়ে গেছে। এর ফলে বেশিরভাগ মিলই এখন কাজ বন্ধ করে দিয়েছে, এবং এতে হাজার হাজার শ্রমিকের জীবন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। শ্রমিকেরা বলছেন, শ্রমিকেরা প্রতিদিন সামান্য সময় বসে থাকছেন, কারণ কাঁচা পাটের সংকটের কারণে মালিকরা উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন। এর ফলে শ্রমিকদের কর্মসংস্থান হুমকির মুখে পড়েছে।
খুলনার দৌলতপুর এলাকার দৌলতপুর জুট মিল গত দেড় মাস ধরে কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে। শ্রমিকরা বলছেন, কাঁচা পাটের অভাবে মিলগুলোতে কাজ নেই, তাই তারা কাজ করতে আসছেন না। শ্রমিকদের একজন আসাদুজ্জামান বলেন, “আমি গত দেড় মাস ধরে এখানে আসছি, কাজের জন্য হালকা আশায় থাকি, কিন্তু কোনো কাজ নেই। কাঁচা পাটের অভাবে মালিকরা মিল চালাতে পারছেন না, আর যদি যত দ্রুত সম্ভব এই সংকট সমাধান না হয়, তবে কেবল কাজ হারানোর আশঙ্কাই বেড়েই চলবে।” অন্য শ্রমিক হাবিবুল্লাহ বলেছেন, “আমাদের দিয়ে মালিকরা খুব কম টাকা আয় করেন, আর আমরা সেই টাকা নিতে পারি না। এই তিন বছর আমাদের জীবন ভালো চলছিল, কিন্তু এখন দেড় মাস ধরে আমরা বিনা কাজের মাঝে আছি। মালিকেরা যদি সরকারি নীতিনির্ধারণে সক্রিয় না হন, তবে এই সংকট আরও দীর্ঘস্থায়ী হয়ে যেতে পারে।”
মিলের মালিকেরা জানাচ্ছেন, মৌসুমের শুরুতে তাঁরা যদি পাটের দাম প্রতি মণ ৩২০০ টাকা কিনে থাকেন, এখন দেড় মাস পরে দাম বেড়ে ৫২০০ টাকায় উঠেছে। দ্বিগুণের কাছাকাছি দাম বৃদ্ধির ফলে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে গেছে, আবার বাজারে পণ্য বিক্রি দরও বেড়েছে না। ফলে উৎপাদনে উদ্যোক্তারা আগ্রহ হারাচ্ছেন। দৌলতপুর জুট মিলের উৎপাদন কর্মকর্তা মোঃ ইসরাফিল মোল্লা জানান, “অতিরিক্ত দামে পাট কিনে এখন সামর্থ্য থাকছে না, আগে যেখানে প্রতি মণে ৩২০০ টাকায় পাট কিনে ৮০ টাকা দরে চাদর বিক্রি করতাম, এখন ৪০০০ টাকা দরেও কিনে মিল চালানোর কথা ভাবা যায়। তবে এখন খরচ এত বেশি যে বিক্রির মূল্য তার চেয়ে কম। ফলে বাধ্য হয়ে দেড় মাস থেকে উৎপাদন বন্ধ রেখেছি।”
তিনি আরও বলেন, “কাঁচা পাটের এই সংকট তৈরি হয়েছে ভুয়া সংকট দেখানোর জন্য। আসলে, গত দুই বছরে এই অঞ্চলের উৎপাদন মাত্রই হয়েছে, কিন্তু ব্যবসায়ীরা দাম artificially বৃদ্ধি করেছে। সরকার যদি তদারকি না করে, তাহলে এই মিলগুলো চালানো সম্ভব নয়।”
অন্যদিকে, কৃষি বিভাগের তথ্য অনুসারে, গত দুই বছর ধরে এই অঞ্চলের কাঁচা পাটের উৎপাদন স্থিতিশীল ছিল, যেখানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৯৪,৬৬৬ মে. টন এবং ২০২৫-২৬ সালে ৯১,১৩৫ মে. টন উৎপাদন হয়েছিল। কৃষি অধিদফতরের গড় হিসেবেও দেখা যায়, এই দুই বছর জেলাগুলোর উৎপাদন খুব একটা পরিবর্তন হয়নি।
বাজারের অস্থিতিশীলতা ও উর্ধ্বমুখী দামের জন্য কিছু সিন্ডিকেট মূলত পাট মজুত করে রাখছে এবং দাম artificially বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠছে। বাংলাদেশ জুট মিল এ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক মোঃ জহির উদ্দিন বলছেন, “নতুন সরকারকে বাজার নিয়ন্ত্রণ, ভর্তুকি আর তদারকি আরও বাড়ানো দরকার। অসাধু ব্যবসায়ীরা কাঁচা পাট মজুত করে চকচকে করে দিচ্ছে, যার ফলে বাজারের স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ব্যাংক ঋণের সংকটও রয়েছে, যা এই খাতে বড় সমস্যা। তাই সরকারকে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে।”
পাট অধিদফতর জানিয়েছে, বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রয়েছে এবং নিয়মিত নজরদারির মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। খুলনা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সরজিত সরকার বললেন, “আমরা আহ্বান জানিয়েছি, একজন আড়তদার বা ডিলার সর্বোচ্চ এক মাসে ৫০০ মণ পাট মজুত রাখতে পারবেন, এই নিয়মের যথাযথ প্রয়োগের জন্য নজরদারি চালাচ্ছি। দাম যাতে স্বাভাবিক থাকে, তার জন্য নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। আশা করছি শিগগিরই এই সংকট কেটে যাবে এবং বাজার স্বাভাবিক হবে।”
খুলনা অঞ্চলে ইজারাকৃত ও বেসরকারি মিল মিলিয়ে মোট ২০টি পাটকল রয়েছে। এখানে প্রায় প্রতি মাসে ২৫,০০০ মেট্রিক টন পাটপণ্য উৎপাদিত হয়, যার বড় অংশই বিদেশে রপ্তানি হয়। তবে বর্তমানে এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে, উৎপাদন ও রপ্তানিতে বিরূপ প্রভাব পড়ে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

