মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের ওপর হামলা দুই সপ্তাহের জন্য স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছেন। এর পর ইরানের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা সুপ্রিম সিকিউরিটি কাউন্সিল এই ঘোষণা স্বাগত জানিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছে। পাশাপাশি ইসরাইলও হামলা বন্ধে সম্মত হয়েছে। এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ১০ শতাংশ কমে গেছে।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরানের পাল্টা ১০ দফা প্রস্তাবে ট্রাম্প ইতিমধ্যেই সম্মতি জানান এবং এক সাময়িক পদক্ষেপে হামলা বন্ধের ঘোষণা দেন। পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই পক্ষ বৈঠকে বসে এ সিদ্ধান্ত নেয় যে, তারা দুই সপ্তাহের মধ্যে একটি স্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে পৌঁছাবে।
মঙ্গলবার রাতে মার্কিন সময় রাত ৮টায় এবং বাংলাদেশ সময় বুধবার সকাল ৬টায় ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যালে ঘোষণা করেন যে তিনি ১৫ দিনের জন্য হামলা স্থগিত করছেন। এর কিছুক্ষণ পরে হোয়াইট হাউজও এই সিদ্ধান্তের কথা জানায়। এর পূর্বে, ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল এই ঘোষণা স্বাগত জানিয়ে তাদের համաձայնের কথা প্রকাশ করে। তাঁরা এই যুদ্ধবিরতিকে ‘ইরানের বিজয়’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে এবং পরবর্তী ধাপে স্থায়ী শান্তি চুক্তির জন্য আলোচনা পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হবে বলে জানানো হয়েছে।
এই ঘোষণা আসার সময়ের কিছু আগে ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের উপর সাময়িক এই হামলা বন্ধের শর্ত হলো, ইরান অবিলম্বে এবং সম্পূর্ণ নিরাপদে আন্তর্জাতিক নৌপথ হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল উন্মুক্ত করে দেবে। ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন, এটি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের ১১ ঘণ্টার বিশেষ প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি তাঁর সামাজিক মাধ্যমে লিখেন, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্টের অনুরোধে তিনি এই স্থগিতাদেশে রাজি হয়েছেন।
তিনি আরো বলেন, এই স্থগিতাদেশ কার্যকর হবে যতক্ষণ না ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধে জাহাজ চলে যেতে দেবে। ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তে পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যস্থতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘পাকিস্তানের সরকারের অনুরোধে এবং ইরানের প্রস্তাবের ভিত্তিতে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, এই প্রস্তাব আলোচনা চালানোর জন্য একটি কার্যকর ভিত্তি সৃষ্টি করবে।’
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে, যা ‘সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল’ নিশ্চিত করেছে। বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির সরাসরি অনুমোদনে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হচ্ছে। এটিকে ‘ইরানের বিজয়’ হিসেবে ধরা হচ্ছে, কারণ তারা পরে আলোচনা চূড়ান্তভাবে চালিয়ে যেতে চায়।
অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘোষণার পর ইসরায়েলও ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের জন্য সাময়িক যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে বলে খবর পড়েছে। এই তথ্য মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন ও ইসরায়েলের সরকারি সম্প্রচার ‘কান’ নিশ্চিত করেছে। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা বলেছেন, যখনই ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল শুরু করবে, তখনই এ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে।
তবে এখনো পর্যন্ত ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি আসেনি। এমনকি, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী ও সামরিক কর্মকর্তারাও ‘হামলা বন্ধ’ সম্পর্কিত কোনো নির্দেশনা দেয়নি।
এর আগে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অনুরোধ করেছিলেন, ইরানের সঙ্গে চুক্তির সময়সীমা আরও দুই সপ্তাহ বাড়াতে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, চলমান কূটনৈতিক পদক্ষেপগুলো ইতিবাচক ফল আনবে ও একটি স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাতে সাহায্য করবে। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ নিরসনে শান্তিপূর্ণ আলোচনার প্রক্রিয়া এগিয়ে যাচ্ছে। আমি ট্রাম্পকে অনুরোধ করছি, সময় দুই সপ্তাহ বাড়ানোর জন্য।’
শাহবাজ শরিফের এই প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের নজরে আসে এবং তাঁরা দ্রুতই এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবে, এই খবর জানিয়েছে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রস্তাবটি সম্পর্কে অবগত আছেন এবং তার প্রতিক্রিয়া দেওয়ার জন্য কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।
প্রসঙ্গত, ইরানও এই কূটনৈতিক প্রচেষ্টাগুলোকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। রয়টার্সের এক সাক্ষাৎকারে ইরানের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন যে, শাহবাজের প্রস্তাবকে তারা ইতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করছে ও সমঝোতার জন্য কিছু সময় চায়। চলমান এই পরিস্থিতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সমাধানে এগোতে পারে বলে আশা করছে সবাই।
