যুদ্ধবিরতির মধ্যেই লেবাননে ব্যাপক বোমা বর্ষণে হাজারো সাধারণ মানুষ দুর্ভোগে পড়েছে। শতাধিক বিমান হামলায় বৈরুত ও দক্ষিণ লেবানে বিভিন্ন স্থানে কয়েকশ হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে, যার প্রেক্ষিতে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) অবিলম্বে হামলা বন্ধ করতে ইসরায়েলকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
আইআরজিসি-র ওই সতর্কবার্তা ইরানের আধা-সরকারি সংস্থা তাসনিম নিউজে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, “আমাদের প্রিয় লেবাননের ওপর আগ্রাসন অবিলম্বে বন্ধ করা না হলে, আমরা এই অঞ্চলের দুষ্ট আগ্রাসনকারীদের কঠোর জবাব দেব।”
লেবাননের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সূত্র জানিয়েছে, তারা আজ পর্যন্ত সময়সীমা ঘোষণা করেছে—যদি ইসরায়েলি হামলা অব্যাহত থাকে, তাহলে আগামী শুক্রবারের পরিকল্পিত আলোচনা তারা বাতিল ভাববে এবং তাতে অংশগ্রহণ করবে না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ ইরানী কর্মকর্তাও আলজাজিরার কাছে বলেছেন, লেবাননে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড ও যুদ্ধবিরতির শর্ত ভঙ্গের জবাবে তেহরান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবে। তিনি আরও বলেন, “যুদ্ধবিরতিটি পুরো অঞ্চল জুড়ে প্রযোজ্য। ইসরায়েল বরাবরই কথা ভঙ্গে পরিচিত; তাদের প্রতিহত করতে শুধুমাত্র কথাবার্তা যথেষ্ট নয়।”
একই সঙ্গে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ফার্স নিউজ এক অজ্ঞাত সামরিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, তেহরানও যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের ঘটনার পাল্টা জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সংবাদটি বলেছে, পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তেজনাপূর্ণ হচ্ছে এবং আরও তথ্য পাওয়া গেলে তা জানানো হবে।
এই উত্তেজনার প্রভাব সামুদ্রিক পথে দেখা গেছে—বহু ইরানি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালীর মাধ্যমে তেলবাহী ট্যাংকারের চলাচল আপাতত বন্ধ হয়ে গেছে। ফার্স নিউজ জানিয়েছে, বুধবার সকালে ইরানের অনুমতিতে দুটি ট্যাংকার প্রণালিটি অতিক্রম করলেও পরে চলাচল বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
ঘটনার পেছনের প্রেক্ষাপটেও চোখ রাখতে হবে। সূত্রে বলা হয়েছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানকে লক্ষ্য করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রে হামলা চালানোর পর তেহরান পাল্টা আঘাত হানে; এরপর ইরানের পক্ষে লেবানিজ সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহই ইসরায়েলি ভূখণ্ডে হামলা চালায়। এরপর থেকে ইসরায়েল লেবাননে প্রতিক্রিয়ায় হামলা অব্যাহত রেখেছে। কয়েকদিন আগে মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে বৈরুত ও দক্ষিণ লেবানে একসঙ্গে শতাধিক বিমান হামলারও ঘটনা ঘটে, যার ফল স্বরূপ ব্যাপক প্রাণহানি ও আহতের খবর পাওয়া গেছে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী যেয়াব গালান্ট–কাটজ (Israel Katz) বলেছে, তাদের সামরিক বাহিনী লেবানন জুড়ে হিজবুল্লাহর কমান্ড সেন্টার ও অবস্থানগুলোতে লক্ষ্যভিত্তিক হামলা চালিয়েছে। তিনি হিজবুল্লাহ নেতৃবৃন্দকে কড়া শব্দে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। অন্যদিকে হিজবুল্লাহ-সমর্থক ও লেবাননের কর্মকর্তারা বেসামরিক জনগণের ওপর লক্ষ্যভিত্তিক নয় এমন আক্রমণের নিন্দা জানিয়েছেন এবং হাসপাতালে মৃত ও আহত মানুষের উপসাগর ভরা বলেও জানানো হয়েছে।
দীর্ঘ ৩৯ দিনের সংঘাত শেষে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের জন্য যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। ওই চুক্তিতে লেবানন ফ্রন্টকেও অন্তর্ভুক্ত করার দাবি তোলা হয়; ইরান ১০ দফার শর্তে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হওয়ার কথা জানিয়েছিল, যার মধ্যে ছিল সব রণাঙ্গনে সংঘাত বন্ধ করার কথাও। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছিলেন, লেবাননসহ সবক্ষেত্রে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে—কিন্তু ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তা নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন এবং বলেছেন, লেবানন এখানে অন্তর্ভুক্ত নয়।
মানবিক তথা কূটনৈতিক চাপ বাড়ছে—লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক সব প্রচেষ্টাকে কাজে লাগিয়ে ইসরায়েলের আগ্রাসন বন্ধে মিত্র ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোকে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সূত্র: আলজাজিরা, বিবিসি।

