জেলার কয়রা উপজেলায় জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপক প্রভাবের কারণে পুরো কমিউনিটি এখন গুরুতর ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেছে। ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং লবণাক্ততার কারণে প্রায় ৯৭ শতাংশ পরিবার সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এই পরিস্থিতি আরও নানা চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে, যার মধ্যে দুর্বল অবকাঠামো, লিঙ্গ বৈষম্য এবং অর্থনৈতিক অসামঞ্জস্যই অন্যতম।
জাগ্রতা যুব সংঘ (জেজেএস), জাপানের শাপলা নীড়ের সহযোগিতা এবং জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে পরিচালিত কমিউনিটি রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট (সিআরএ) প্রতিবেদন থেকে এই দুর্যোগের প্রকৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট ছবি উঠে এসেছে।
গতকাল বুধবার নগরীর সিএসএস আভা সেন্টারে অনুষ্ঠিত মিডিয়া সংলাপে এই গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়। এতে মূল প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও গ্রামীণ পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. জাকির হোসেন এবং প্রভাষক মোঃ রিমু মিয়া।
সংলাপে সক্রিয় ছিলেন খুলনা প্রেসক্লাবের আহ্বায়ক এনামুল হক, সদস্য সচিব রফিউল ইসলাম টুটুল, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ আশরাফুল ইসলাম নূর, সংবাদকর্মী এইচএম আলাউদ্দিন, মোসাদ্দেকুর রহমান, মুহাম্মদ নূরুজ্জামান, আবু হেনা মোস্তফাজামাল পপলু, শেখ আল এহসান, দিপংকর রায় ও আয়শা আক্তার জ্যোতি।
সংলাপে গাছ লাগানো, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতের উপর জোর দেওয়া হয় যেন পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা যায়। গবেষকদের মতে, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ দল মিশ্র পদ্ধতিতে এই জরিপ চালানো হয়েছে। এর মধ্যে উত্তর বেদকাশী, দক্ষিণ বেদকাশী ও সদর ইউনিয়নের মোট ৩৮৩ পরিবারকে অন্তর্ভুক্ত করে জরিপ, পাশাপাশি ১২টি ফোকাস গ্রুপ আলোচনা এবং ১২টি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, কয়রার মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো লবণাক্ততা (৮৪.৯%) এবং ঘূর্ণিঝড় (৭৪.৭%)। বিশেষ করে মে ও নভেম্বর মাসে এই ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। জরিপে দেখা গেছে, ৯৫ শতাংশ পরিবার এখনো ঝুপড়ি ঘরে বসবাস করে এবং ৬০.৩ শতাংশের কোন উঁচু ভিত্তি নেই, যা বন্যার সময় বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করে। দুর্ঘটনার সময় ৮২.৮ শতাংশ মানুষ সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, ফলে জরুরি সেবা পৌঁছাতে সময় লাগে।
লিঙ্গভিত্তিক তফাৎও স্পষ্ট, যেখানে ৮৯.৩ শতাংশ উত্তরদাতা জানিয়েছেন যে, সাইক্লোন শেল্টারে নারীদের জন্য নিরাপদ ও আলাদা স্যানিটেশন ব্যবস্থা নেই। এর ফলে অনেক নারী আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ায় অনিহা প্রকাশ করেন এবং হয়রানির আশঙ্কায় তারা উপেক্ষা করেন।
আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার আগে বা পরেই অনেক পরিবার খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় পড়ে। জরিপে দেখা গেছে, এক সপ্তাহের মধ্যেই প্রায় ২৫ শতাংশ পরিবার খাদ্য সংকটে পড়েছে। জীবিকা হারিয়ে ৭৫ শতাংশ পরিবার ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, যার বড় অংশ উচ্চ সুদের ঋণ।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ৭৫.৭ শতাংশ মানুষ ইউএডিসি (ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি) সম্পর্কে জানে না, যা দুর্যোগ মোকাবিলায় বড় ধরনের পরিকল্পনাগত ঘাটতি প্রকাশ করে।
জনপ্রিয় এই সূচক অনুযায়ী, দক্ষিণ বেদকাশী (৪৭.২৪) এলাকাটি সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, যেখানে কয়রা সদর তুলনামূলকভাবে কম ঝুঁকিপূর্ণ (৩৮.৭৪)।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সংকট মোকাবিলায় দ্রুত সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার প্রয়োজন। জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ, ম্যানগ্রোভ বনায়ন, লবণমুক্ত পানির সরবরাহ, নারীবান্ধব আশ্রয়কেন্দ্র এবং সম্প্রদায় ভিত্তিক অর্থনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করতে হবে।
অতিরিক্ত, ইউনিয়ন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির কার্যক্রম সক্রিয় করা, নিয়মিত জনসম্পৃক্তি সভা আয়োজন এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রশিক্ষণ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পর্যাপ্ত পরিকল্পনা না থাকলে কয়রার মানুষ জলবায়ু সংকট আরও দীর্ঘমেয়াদি ও গভীর হতে পারে। যুদ্ধকালীন তীব্রতার সাথে তাদের জন্য টেকসই ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে যেন এই ঝুঁকি কমানো যায় এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত থাকা সম্ভব হয়।

