রাজধানী পল্লবী এলাকায় শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনায় জড়িত আসামিদের বিরুদ্ধে গত ২ জুন ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্যদান অনুষ্ঠিত হয়েছে। ভিকটিমের মা পারভিন বেগম, বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা এবং বোন রাইসা আক্তারসহ মোট ১০ জন তাদের বিবরণ প্রদান করেন। আজকের সাক্ষ্যগ্রহণের দিনটি ছিল গভীর ভাবনায় егোড়ানো এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সাক্ষ্যদানকারী ওভক্তির মাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে ঘটনার সময় কীভাবে ঘটেছিল তার বিবরণ তুলে ধরেছেন সাক্ষীরা। রামিসার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা জানান, তিনি ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টায় অফিসে যাচ্ছিলেন। অফিসের ঠিকানা ছিল বনানীর কাকলী। এ সময় তার স্ত্রী পারভীনা আক্তার ফোন করে তাকে বাসায় ফিরে আসার জন্য বলেন। বাসায় এসে তিনি দেখতে পান মেইন গেটের সামনে অনেক মানুষ জড়ো হয়েছেন। এরপর তিনি দৌড়ে গিয়ে ফ্ল্যাটের সামনে যান এবং সুচিন্তিতভাবে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেন।
তিনি বলেন, ‘আমার স্ত্রীর দিকে তাকানোর পর বুঝতে পারি, তার সাথে আসামিরা দরজায় খোঁচাচ্ছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে হাতুড়ি নিয়ে দরজা ভাঙার চেষ্টা করি। সবাই মিলে দরজাটা পুরোটা ভেঙে ফেলি এবং ভেতরে প্রবেশ করি। প্রথমে দেখি কমন রুমের মেঝেতে সামান্য রক্ত লেগে রয়েছে। সেখানে স্বপ্না দাঁড়িয়ে ছিল, কিছু বলছিল না। এরপর আমরা সব দরজা ভেঙে ফেলি এবং তল্লাশি চালাতে থাকি। অবশেষে বেডরুমের দরজা ভেঙে গেলে বিচ্ছিন্ন মাথা দেখার পর আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। তখন কি হয়েছে তা বলতে পারছি না।’
জেরা চলাকালে আসামি পক্ষের আইনজীবী প্রশ্ন করেন, ‘তুই কি নিজের চোখে দেখেছিস?’ বাবা উত্তরে জানান, ‘আমি যতটুকু দেখেছি তাই বলছি।’
সেই সঙ্গে রামিসার মা পারভিন বেগমও তার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেন। তিনি জানান, ‘প্রায় সকাল দশটার দিকে আমি রান্না করছিলাম। তখন আমার মনে হয়েছিল পাশের ফ্ল্যাটে কোনো শিশু চিৎকার করছে। আমি ভাবছিলাম, নিশ্চয়ই ছোট কেউ হয়তো কিচ্ছু বলছে। তবে আমার মন তখন বুঝতে পারছিল না ঠিক কি ঘটছে। কিছুক্ষণ পর বড় মেয়ে এসে জানায় রামিসা এখনো বাড়িতে ফিরনি। আমি ওকে জিজ্ঞেস করি, “তুমি কি রামিসার কিছু জানো?” কিন্তু ও বলে, “না, আমি তার সাথে যাইনি।”
আমার আশেপাশে খুঁজতে খুঁজতে রামিসার জন্য আমি খুব ব্যাকুল হয়ে পড়ি। প্রত্যেককে জিজ্ঞেস করলেও কেউ কিছু জানায় না। তখন আমি নিচে একটা অফিসের মধ্যে গিয়ে দেখলাম, সেখানে আমার মেয়েটি আছে কি না। এরপর দোতলায় খোঁজ করতে শুরু করি, কিন্তু সেখানে আমার মেয়ে দেখা যায়নি। পাশের ফ্ল্যাটের দরজায় কড়কড়ি করে ডাকতে থাকি, কিন্তু কেও সাড়া দেয় না। হঠাৎ করে আমার চোখে পড়ে দরজার সামনে রামিসার একটি স্যান্ডেল। তখন আমি বুঝতে পারি, হয়তো মেয়ে ওই ফ্ল্যাটে আটকে থাকতে পারে।
উপস্থিত অন্যান্য ব্যক্তিরা জানান, তখনই আশপাশের একজন নারী ধীরে ধীরে নিচে নামেন। তিনি জানান, ‘আমরা সবাই মিলেই দরজা ভেঙে ভিতরে প্রবেশ করি। তখন দেখলাম, বাথরুমে অসংখ্য রক্তের দাগ পড়ে আছে। এক পর্যায়ে আমার চোখে পড়ে রামিসার বিচ্ছিন্ন মাথা। তারপর পুলিশ এসে তার জামা ও লাশ উদ্ধার করে।’
রামিসার মা আরও বলেন, ‘আমি স্বপ্নাকে বারবার বলেছি, “তুমি দরজা খুলো, খোলা দাও,” কিন্তু ও খুলে দেয়নি। আমি ওর প্রশ্ন করতে পারিনি, উপস্থিত লোকজনই করেছে। পরে শুনেছি, সোহেল রানা গেট কেটে পালিয়ে গেছে।’
ক্যামেরার সম্মুখে রামিসার মা সোহেল রানাকে দেখিয়ে বলেন, ‘তারা হতো হত্যা করছে, ধর্ষণও করছে।’
অন্যদিকে, মেয়ে রাইসা আক্তার শিশু সাক্ষী হয়ে তার বলছে, তিনি দেখেন, কাছের বাসার জানালা দিয়ে একজন অচেতন অবস্থায় খালি গায়ে দৌড় দিয়ে চলে যাচ্ছে। তিনি অনেকবার চিৎকার করেন, কিন্তু কেউ সাড়া দেয় না। পরে তিনি উদ্ধার করেন রামিসার লাশ এবং ঘটনার বিস্তারিত জানাতে পারেন।
প্রথমে, সকাল পৌনে ৯টায় সোহেল রানা ও তার স্ত্রীর আদালতে হাজির করা হয়। এই ঘটনায় গত ১৯ মে সকালে রামিসার মস্তকবিহীন লাশ এবং বাথরুমে বিচ্ছিন্ন মাথা উদ্ধার হয়। মামলার বাদী তার বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা পল্লবী থানায় অভিযোগ করেন। এ ঘটনার জন্য সোহেল রানা ও তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ধর্ষণ, হত্যা, এবং লাশ গোপনের অভিযোগে মামলা দায়ের হয়। পরে, ২০ মে সোহেল রানা আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি দেন।

