ঘোড়ার মাংস বাণিজ্য নিষিদ্ধকরণ ও তাৎক্ষণিক তদন্তের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট দেয়া হয়েছে। সোমবার (১১ মে) জনস্বার্থে রিট করেন বাংলাদেশ অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন, এ কে খান হেলথকেয়ার ট্রাস্ট এবং অভিনেত্রী ও প্রাণী কল্যাণকর্মী জয়া আহসান।
রিট সংক্রান্ত আইনজীবী হিসেবে উপস্থিত আছেন ব্যারিস্টার সাকিব মাহবুব, ডা. সিনথিয়া ফরিদ এবং অ্যাডভোকেট সাজিদ হাসান। পিটিশনে তারা আদালতকে জানায় যে অসুস্থ প্রাণীদের মাংস মানুষকে খাবারের হিসেবে প্রতারণামূলকভাবে বাজারজাত করা হচ্ছে এবং এ ধরনের অবৈধ ব্যবসা জনস্বাস্থ্য ও প্রাণীর কল্যাণের জন্য বিপজ্জনক।
রিটে দাবি করা হয়েছে— মন্ত্রণালয়সমূহের আগের অভিযুক্তি উপেক্ষিত থাকায় উচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। গাজীপুরে উন্মোচিত অবৈধ ঘোড়ার মাংস বাণিজ্যের বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ, সময়সীমাবদ্ধ ও স্বতন্ত্র তদন্ত চালানোর নির্দেশ, তদন্তের প্রতিবেদন হাইকোর্টে দাখিল করার আদেশ, এবং অবৈধ চর্চা প্রতিরোধে ৬০ দিনের মধ্যে একটি জাতীয় নির্দেশিকা ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের নির্দেশ দেওয়া হোক বলে তারা আবেদন করেছেন।
পিটিশনের আরও দাবি— বাজেয়াপ্ত ও অসুস্থ ঘোড়াগুলো নিলামে বিক্রি বন্ধ করা, উদ্ধারকৃত প্রাণীদের পরিচর্যা ও পুনর্বাসনের জন্য যথাযোগ্য ব্যবস্থা গ্রহণ এবং একটি অভয়ারণ্য হিসেবে বাংলাদেশ অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশনকে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের নির্দেশনা জারি করা।
রিটে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে গাজীপুর জেলা প্রশাসন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন-১ ও পুলিশের যৌথ অভিযানে একটি কটন কারখানাকে অবৈধভাবে জবাইখানায় পরিণত করে ব্যপক ঘোড়ার মাংস বাণিজ্যের চক্র ধরা পড়ে। অভিযানে প্রায় ৩৬টি গুরুতর অসুস্থ ঘোড়া, ৮টি জবাইকৃত ঘোড়ার মৃতদেহ এবং বিপুল পরিমাণ মাংস উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধারকৃত প্রাণীগুলো অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় পাওয়া যায়— প্রচণ্ড অপুষ্টি, চিকিৎসাবিহীন সংক্রমণ, উন্মুক্ত ক্ষত, পোকা সংক্রমণ, টিউমারসহ অন্যান্য গুরুতর আঘাত দেখা যায়। চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস ইউনিভার্সিটি কর্তৃক করা পরীক্ষায় অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া, পরজীবী ও ছত্রাক সংক্রমণ এবং সন্দেহভাজন যক্ষ্মার লক্ষণ শনাক্ত হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করে এবং প্রাণী থেকে মানুষে সংক্রামিত হতে পারে। এই দূষিত মাংস মানুষকে খাবারের নামে, এমনকি গরুর মাংস বলে বিভ্রান্ত করে বিক্রি করা হচ্ছিল।
আদালতে বলা হয়েছে— কর্তৃপক্ষ কিছু সময়ে অভিযানের মাধ্যমে এসব কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে ও মনিটরিং ঘোষণা করা হলেও তা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। গাজীপুরে পরে একটি মোবাইল কোর্ট ঘোড়ার মাংস বিক্রি নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেও অপরাধীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে কার্যকর পদক্ষেপ নেই।
অভয়ারণ্য—বাংলাদেশ অ্যানিম্যাল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন বারবার গাজীপুর পুলিশ ও জেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিস্তারিত তথ্য ও নথিপত্র সরবরাহ করে সহায়তা চেয়েছেন। ততেও অপরাধীদের ধরতে বা দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে সুষ্ঠু উদ্যোগ নেই বলে তারা অভিযোগ করেন। উদ্ধারকৃত কিছু ঘোড়া জেলা প্রশাসকের নির্দেশে অভয়ারণ্যে হস্তান্তর করা হলেও সংস্থার সীমিত সক্ষমতার কারণে সব প্রাণী নেয়া সম্ভব হয়নি এবং নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে বাজেয়াপ্ত অসুস্থ ঘোড়াগুলো নিলামে বিক্রি করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
রিটে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বরেও পিটিশনাররা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে আনুষ্ঠানিক চিঠি দিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা চেয়েছিলেন; তবে ফলপ্রসূ সাড়া না পেয়ে তারা হাইকোর্টে জনস্বার্থে রিট করেন। রিটকারীরা জোর দিয়ে বলেন যে তাৎক্ষণিক বিচারিক হস্তক্ষেপ ছাড়া এই অবৈধ কার্যক্রম স্বাস্থ্যঝুঁকি ও প্রাণীর প্রতি নির্মম আচরণ চালু রাখবে। আদালত থেকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা না এলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে পারে—এই আশঙ্কা জানানো হয়েছে।

