শরীয়তপুর সদর উপজেলার চন্দ্রপুর এলাকায় এক নারী স্বামীকে হত্যা করে মরদেহ টুকরা করে বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। পুলিশের বরাত দিয়ে জানা গেছে, শুক্রবার (১৫ মে) রাত পৌনে ১০টার দিকে আটং বৃক্ষতলা সড়কের পাশে একটি অংশ — মাথাসহ মরদেহের খণ্ডিত অঙ্গভাগ — উদ্ধার করা হয়েছে।
আহত ব্যক্তির পরিচয়ে সংবাদে মিলছে ভিন্নতা। স্থানীয় কয়েকজন সূত্রে বলা হচ্ছে নিহত জিয়া সরদার (৪০), তিনি সাবেক মেম্বার রাজ্জাক সরদারের ছেলে। তবে পুলিশ বলছে ভুক্তভোগীর নাম জয়নাল আবেদিন। অভিযুক্ত আসমা বেগম পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার জুপিয়া গ্রামের সোলেমান শেখের মেয়ে। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে আসমা হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করেছেন।
পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ আলম জানান, দম্পতির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে দাম্পত্য কলহ চলছিল। দুজনেরই এটি দ্বিতীয় বিয়ে। আসমার পূর্ববতী সংসার থেকে এক ছেলে (প্রায় ১৭-১৮) ও এক মেয়ে (প্রায় ১৫)। জয়নাল কিছু সময় মালয়েশিয়ায় ছিলেন। ২০১৯ সালে তারা গোপনে বিয়ে করেন এবং পরে একসঙ্গে বিভিন্ন ভাড়াবাড়িতে থেকেছেন।
ওসি জানান, আসমা ও জয়নালের সম্পর্ক মোবাইল ফোনের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। একপর্যায়ে জয়নাল দেশের বাইরে ছিল, পরে দেশে ফিরে ২০১৯ সালে শরীয়তপুর শহরে আসমাকে নিয়ে বসবাস শুরু করেন। চলতি বছর কোরবানির আগে তারা আবার চন্দ্রপুর ভাড়া বাসায় ওঠেন।
পুলিশি বর্ণনায় হত্যাকাণ্ড ঘটেছে গত মঙ্গলবার (১২ মে) ভোরের দিকে। ওসির তথ্যে, রাত আনুমানিক ২টায় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বাক্যালাপকে কেন্দ্র করে ঝগড়া বাধে; জয়নালের অন্য এক মেয়ের সঙ্গে কথা বলার অভিযোগ তোলে আসমা। অভিযোগ অশান্তিতে পুরোগিয়ে একপর্যায়ে ঘরে থাকা একটি রড দিয়ে আসমা জয়নালের উপর আঘাত করে। জয়নাল অচেতন হলে পরে আরও আঘাত করা হয়। পরদিন তিনি মৃত বলে বিবেচনা করলে আসমা চাকু দিয়ে হাত-পা কেটে আলাদা করেন এবং পেট কেটে নড়িভুড়ি একটি ড্রামে ভরে রাখেন—শুধু মাথা অক্ষত রাখেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ওসি শাহ আলম বলেন, কয়েক দিন পরে মরদেহ কাটা থাকায় দুর্গন্ধ শুরু হলে আসমা ও তিনি সম্পর্কিত কয়েকজন মরদেহের কিছু অংশ বস্তায় ভরে অটোরিকশা যোগে নড়িয়া নদীর পাড়ে রেখে আসেন। বাকিগুলো প্লাস্টিক ব্যাগ ও ড্রামে ভরে অন্য কোনো স্থানে রেখে আসেন এবং একটি ড্রাম তিনি এক চিকিৎসকের বাড়িতে রাখেন। পরে ওই চিকিৎসক ড্রামের মধ্যে থেকে দুর্গন্ধ পেয়ে পুলিশকে জানালে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আসমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি হত্যার কথা স্বীকার করেন।
আসমার নির্দেশে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন খণ্ডিত অংশ উদ্ধার করেছে। বর্তমানে আসমা, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত রড, ছুরি ও ড্রাম পুলিশের হেফাজতে রয়েছে। ওসি বলেন, আসমা প্রাথমিকভাবে সব স্বীকার করেছেন এবং জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার কথায় অসঙ্গতি পাওয়া যায়নি। নিহত ব্যক্তির পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে; পরিবার যদি অভিযোগ দায়ের করে আদালত-পথে কার্যক্রম শুরু করা হবে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ক্যামেরার সামনে আসমা বেগম বলেন, ‘দুইজন হাতাহাতি করতে করতে দরজার পাশে থাকা রড দিয়ে মারি। বুঝিনি এত দ্রুত মৃত্যু হবে। আমি একা করেছি, চাকু দিয়েই কেটেছি। কোথায় কোথায় ফেলেছি—নরিয়া নদীর পাড়ে ফেলেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আগে কখনও কাউকে মেরেছি না, এক পিপড়া খেতেও মারিনি। এখন নিজে কী করেছি নিজেও বুঝি না, এটা শয়তানের কাজ।’
পুলিশ ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত চালাচ্ছে। উদ্ধারকৃত দেহের অংশগুলো মোটিভ ঘটনার সাথে মিলিয়ে ফরেনসিক প্রতিবেদন ও প্রয়োজনীয় আইনি বিভাগের সহায়তায় পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।
