ফাল্গুনের শেষ, চৈত্রের শুরু—খুলনার কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের গৃহিণী আম্বিয়া খাতুনের প্রতিটি সকাল শুরু হয় এক কষ্টসাধ্য কাজ নিয়ে। ঘুম থেকে উঠে পরিবারের জন্য প্রথম ভাবনা—কোথা থেকে হবে পানি? দূরের গভীর নলকূপ থেকে একটি কলস ভরা পানি আনতেই তাকে প্রতিদিন পাঁচ থেকে ছয় কিলোমিটার হাঁটতে হয়। দেহ ক্লান্ত হয়, অসুস্থও হয়ে পড়েন কখনও। নলকূপে যেতে না পারলে বাধ্য হয়ে ব্যবহার করতে হয় পুকুরের অনিরাপদ পানি; কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে সেসব পুকুরও শুকিয়ে যায়, নদী-খাল তখন লবণাক্ত হয়ে যায়, আর বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র রূপ ধারণ করে। এমন কিছু দিন আসে যখন রান্নাও করা যায় না পানির অভাবে।
এই হতবাক করা বাস্তবতা শুধু আম্বিয়ার ঘরের দোরেই সীমাবদ্ধ নয়—বাংলাদেশের পুরো দক্ষিণ উপকূল জুড়ে মিঠাপানির উৎস ঝুঁকির মুখে। গবেষণায় দেখা গেছে উপকূলীয় এলাকার একজন নারী প্রতিদিন এক কলস পানির জন্য পাঁচ-ছয় কিলোমিটার হাঁটেন এবং বছরের চার থেকে সাত মাস পর্যন্ত এই সংকট স্থায়ী হয়। যে অর্ধেকের বেশি পরিবার নিজস্ব কোনো নিরাপদ পানি উৎস রাখে না—প্রায় ৮৪ শতাংশ পরিবারই নিরাপদ উৎসবিহীন এবং দূর-দূরান্ত থেকে পানির ওপর নির্ভরশীল।
গত কল্লোলের তথ্য বলছে, গত চার দশকে উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ত জমির পরিমাণ প্রায় ২৭ শতাংশ বেড়েছে। তা শুধু ভূপৃষ্ঠেই নয়—ভূগর্ভস্থ পানিতেও লবণ সম্প্রসারণ রেকর্ড করা হচ্ছে। উপকূল থেকে ৫০–৭০ কিলোমিটার উজান পর্যন্ত ভূগর্ভস্থ জলে নোনাপানির উপস্থিতি ধরা পড়ছে; ফলে স্বাভাবিক স্বাদুপানির ঝুঁকি বাড়ছে। জলবায়ুর পরিবর্তনে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার ফলে নোনাপানি ধীরে ধীরে ঢুকে মিঠাপানির সংরক্ষণহীনতা বাড়াচ্ছে।
প্রতিকূলতার ফলে কৃষিও বিপর্যস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশের মোট আবাদি জমির প্রায় ৩০ শতাংশ উপকূলীয় এলাকায় অবস্থান করে—যার মধ্যে প্রায় ৫৩ শতাংশ জমি সরাসরি লবণাক্রান্ত। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ২৮.৬ লাখ হেক্টরের উপকূলীয় অঞ্চলের মধ্যে ১০.৫৬ লাখ হেক্টর জমি বিভিন্ন মাত্রায় লবণাক্ত হয়ে পড়েছে। ফলে ফসলের উৎপাদন কমছে, জীবিকা সংকুচিত হচ্ছে এবং লোকজন জীবিকা খোঁজে স্থান ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে দরিদ্র সম্প্রদায়। অনেক পরিবার টাকার শক্তি থাকায় বাজার থেকে বোতলজাত পানি কিনে নিতে পারে, কিন্তু যাদের সামর্থ্য নেই তারা বাধ্য হয়ে লবণাক্ত পানি পান করছে—যার ফলে স্বাস্থ্যের ঝুঁকি, চিকিৎসা ব্যয় ও আর্থিক বোঝা বাড়ছে। গভীর নলকূপ বা পাইপলাইনভিত্তিক সেবা যে সমাধান তা নয়—অনেক জায়গায় নলকূপের জলও লবণাক্ত অথবা ভূগর্ভস্থ স্তর নেমে যাওয়ার কারণে পানি উঠে না। ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডর ও ২০০৯ সালের ঘূর্ণিঝড় আইলার পর মিঠাপানির উৎস দ্রুত দূষিত হওয়ার ফলে সমস্যা আরও বাড়ে।
বাড়তি বৃষ্টি থাকলেও তা ধরার উদ্যোগ নিলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বস্তিকর করা যায়। উপকূলীয় অঞ্চলে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত ৩০০০ মিলিমিটারেরও বেশি—এখনওও বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা হলে শুষ্ক মৌসুমে মানুষ তা ব্যবহার করতে পারবে। প্রাচীনকাল থেকে মাটির পাত্র, মটকা রাখা থেকে শুরু করে এখন ছাদ বা চাল থেকে পাইপের মাধ্যমে ট্যাঙ্কে পানি জড়ো করে রাখা—রেইন ওয়াটার হার্ভেস্টিং—জনপ্রিয় হয়েছে। সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও ফিল্টার করলে বৃষ্টির জল কয়েক মাস ব্যবহার উপযোগী রাখা যায়। সরকার ও বিভিন্ন সংস্থা অসচ্ছল পরিবারকে পানি ট্যাংক দিচ্ছে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি টেকসই সমাধানের জন্য বড় পরিকল্পনা দরকার।
বর্তমানে উপকূলে ব্যবহৃত নিরাপদ পানির উৎসগুলোতে রয়েছে—গভীর নলকূপ, পাইপলাইন, পন্ড স্যান্ড ফিল্টার (পিএসএফ), রিভার্স অসমোসিস (আরও) প্ল্যান্ট এবং বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ব্যবস্থা। এগুলোর প্রত্যেকটির সীমাবদ্ধতা আছে: নলকূপে লবণ বা পানি না ওঠা, আর.ও. প্ল্যান্ট বেশ ব্যয়বহুল ও রক্ষণাবেক্ষণ-নির্ভর, পিএসএফ সব জায়গায় কার্যকর নয়। তাই একক প্রযুক্তি নয়, একাধিক সমন্বিত উদ্যোগ দরকার।
সমস্যা মোকাবিলার জন্য জরুরি ও কার্যকর কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে—বৃষ্টির পানি সংগ্রহ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থার বিস্তার ও সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ, নতুন খাসপুকুর খনন ও পুরনো পুকুর পুনঃখনন, পুকুরে লবণপানি ঢুকতে বাধা এবং পোল্ডার-ভিত্তিক বাঁধি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, নিরাপদ গভীর নলকূপ স্থাপন এবং দরিদ্রদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে পানির ব্যবস্থা, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে টেকসই পানি ব্যবস্থাপনার মডেল গঠন—এসব পদক্ষেপ অবিলম্বে শুরু করতে হবে।
উপকূলীয় অঞ্চলের সুপেয় পানির সংকট আজ এক পরিবেশগত সমস্যা না হয়ে মানবিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে পরিণত হয়েছে। জলবায়ুর অব্যাহত পরিবর্তন ও সমুদ্রপৃষ্ঠের বৃদ্ধি রোধ করা না গেলে ভবিষ্যত আরও কঠিন হবে। সময়ের দাবি—বৃহৎ, সমন্বিত এবং টেকসই প্রকল্প; যাতে শুধু সমস্যার আপৎকালীন সমাধান নয়, দীর্ঘমেয়াদি পানি নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা যায়। সুপেয় পানি নিশ্চিত করা কোনো আভিজাত্য নয়—এটি উপকূলবাসীর বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার।
লেখক: মহাপরিচালক, বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ।
