যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তর (ইউএসটিআর) গত কয়েক দিনে ৬০টি দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, যেসব দেশ জোরপূর্বক শ্রম (forced labour) বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ায় ব্যর্থ হয়েছে এবং শ্রম ও উৎপাদন সংক্রান্ত মানদণ্ড পূরণে ঘাটতি রয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা হবে। প্রস্তাবিত হারে কিছু দেশের ওপর ১০ থেকে ১২.৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তি শুল্ক ধার্য করার কথা বলা হয়েছে; বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রস্তাব করা হয়েছে ১০ শতাংশ প্রযোজ্য শুল্ক।
ইউএসটিআরের কড়া ভাষ্য অনুযায়ী, জোরপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে তৈরি পণ্য আমদানি প্রতিরোধে বড় বাণিজ্য অংশীদারদের ব্যর্থতা যুক্তরাষ্ট্রজনিত কর্মসংস্থান ও বাজারে অনুচিত প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করছে। প্রতিষ্ঠানটির ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভ জেমসন গ্রিয়ারও একই ধরনের তাগিদ তুলেছেন। তবে যেসব দেশ এই অভিযোগের মুখে পড়েছে, তারা সাধারণত অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এই পদক্ষেপের প্রশাসনিক ও আইনগত পটভূমিও গুরুত্বপূর্ণ। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে ‘এ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড’ শিরোনামে এক চুক্তি হয়েছিল; সে চুক্তির কারণে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রফতানিতে অতিরিক্ত ১৯ শতাংশ শুল্কের শিকার হতে হয়েছে বলে কথিত আলোচনায় উঠে আসে। পরে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ‘ইউনিভার্সাল বেসলাইন ট্যারিফ’ নামের শুল্ক কাঠামোকে অবৈধ ঘোষণা করলে প্রশাসন অন্য পথ খোঁজে। এরই ধারাবাহিকতায় সেকশন ১২২ নামের আইনি ফ্রেমওয়ার্কে নতুন শুল্ক ব্যবস্থা এবং তদন্ত শুরু করা হয়।
ইউএসটিআর জানিয়েছে, যে দেশগুলো শ্রম স্ট্যান্ডার্ড বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে তাদের বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে; যেখানে আংশিক উন্নয়ন আছে সেখানে তুলনামূলক কম হার নির্ধারণের প্রস্তাব এসেছে। তালিকাভুক্ত দেশে বাংলাদেশের সঙ্গে কানাডা, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশসমূহ, ইন্দোনেশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান, আর্জেন্টিনা, কম্বোডিয়া, মালয়েশিয়া, তাইওয়ান ও যুক্তরাজ্য রয়েছে — এসবের ওপর ১০ শতাংশ বাড়তি শুল্ক প্রস্তাব করা হয়েছে। অন্যদিকে চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ডসহ প্রায় ৪৫টি দেশের পণ্যে ১২.৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া ইউএসটিআর একটি টেক্সটাইল মেকানিজম চালুর প্রস্তাবও দিয়েছে; এতে নির্দিষ্ট পরিমাণ পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্য তুলনামূলকভাবে কম শুল্কে আমদানি করা যাবে—কিন্তু মেকানিজমের বিস্তারিত এখনও প্রকাশ করা হয়নি। কিছু গুরুত্বপূর্ণ খাত যেমন জ্বালানি, বিরল খনিজ, নির্দিষ্ট ধাতু, গরুর মাংস, কফি, নির্দিষ্ট ফল ও সবজি, ওষুধ, জৈব রসায়ন ও বিমানের যন্ত্রাংশকে শুল্ক কাঠামোর বাইরে রাখা হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব খাত যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও সরবরাহ শৃঙ্খলের জন্য অনিবাক্য, তাই কৌশলগতভাবে সেগুলো বাদ রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশে এই ঘোষণার পর রপ্তানি খাত ও অর্থনীতিবিদদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। তারা বলছেন, এই পদক্ষেপ মূলত যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত বাণিজ্য চাপ প্রয়োগের অংশ, যার ফলে তৈরি পোশাক খাত সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হতে পারে। বিজিএমইএ’র সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, এটি ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক নীতির ধারাবাহিক লাইনেই নেয়া পদক্ষেপ — আইনের মারপ্যাঁচে আগে নেয়া ট্যারিফ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অন্য রূপ।
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র অনভিপ্রেত অজুহাতে পুনরায় ট্যারিফ প্রয়োগের চেষ্টা করছে এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক শ্রমের অভিযোগের কোন প্রমাণ তারা দিতে পারবে কি না তা প্রশ্নবিদ্ধ। সংগঠনটির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বাংলাদেশ আইএলও’র কোর কনভেনশনের অধিকাংশে সই করেছে; শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা করে শিল্প চলছে।
অন্যদিকে সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম মনে করেন, বিষয়টি আইনিভাবে পুনরায় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে এবং বাংলাদেশের উচিত শ্রম অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা দূর করা—শুল্ক নিয়ে ভর না করে নিজ উদ্যোগেই খাতে সংস্কার করা।
ইউএসটিআর প্রস্তাবিত শুল্ক এবং অন্যান্য প্রতিকারমূলক ব্যবস্থার উপর জনগণের মতামত আহ্বান করেছে; মন্তব্য গ্রহণের শেষ দিন ধার্য করা হয়েছে ৬ জুলাই এবং ৭ জুলাই একটি গণশুনানি অনুষ্ঠিত হবে। এর পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে কেমন অগ্রগতি হয় তা পরিষ্কার হবে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা, রয়টার্স