বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ারের মাসুদ খান নিয়োগ পেয়েছেন। পাশাপাশি তিন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন নারী আইনজীবী নাহিদ মাহতাব, ঢাকা ব্যাংক সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাফিজ-আল-তারিক এবং আশা ইন্টারন্যাশনালের ফাইন্যান্স ডিরেক্টর তানভীর হাবিব রহমান।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ তাদের নিয়োগ চূড়ান্ত করে জানায় যে প্রত্যেককে চার বছরের মেয়াদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, তারা আজ বিকেল ৩টায় বিএসইসির কার্যালয়ে যোগদান করবেন।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী মাসুদ খানকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩-এর ধারা ৫(২) অনুযায়ী চেয়ারম্যান হিসেবে নামানো হয়েছে। বিধি অনুযায়ী চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব নেওয়ার আগে তাকে অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে কর্ম-সম্পর্ক পরিত্যাগ করতে হবে। তার বেতন, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধাসমূহ সরকারের সঙ্গে করা চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারণ করা হবে।
মাসুদ খান বর্তমানে ক্রাউন সিমেন্ট পিএলসির গ্রুপ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (গ্রুপ সিইও) এবং ইউনিলিভার কনজিউমার কেয়ার লিমিটেডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। করপোরেট খাতে তার অভিজ্ঞতা চার দশক ছাড়িয়ে; তিনি লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশে ১৮ বছর চিফ ফাইন্যান্সিয়াল অফিসার এবং ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকে ২০ বছর জুড়ে ফাইন্যান্সের শীর্ষপদে কাজ করেছেন। তিনি ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ, ম্যারিকো বাংলাদেশ, সিঙ্গার বাংলাদেশ এবং কমিউনিটি ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-র স্বাধীন পরিচালক হিসেবেও রয়েছেন। এই দীর্ঘ কর্মজীবনের কারণে সংশ্লিষ্ট মহলে তার নেতৃত্বে পুঁজিবাজারে ইতিবাচক সংস্কারের প্রত্যাশা প্রকাশ করা হচ্ছে।
মাসুদ খানের নিয়োগ সম্ভব হয়েছে ভিন্ন একটি আইনি পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে। আগে ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন আইন, ১৯৯৩’-এ চেয়ারম্যানের বয়সসীমা সর্বোচ্চ ৬৫ বছর ধার্য ছিল। তবে জাতীয় সংসদে ৩০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (সংশোধনী) বিল, ২০২৬’ পাস হওয়ার ফলে ওই বয়সসীমা কেয়ার ছাড়া করা হয় এবং ৭১ বছর বয়সী এই করপোরেট নেতার কমিশন প্রধান হওয়ার পথ খুলে যায়।
এর আগে বিদায়ী চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ এবং চার কমিশনার—মু. মহসীন চৌধুরী, মো. আলী আকবর, ফারজানা লালারুখ ও মো. সাইফুদ্দিন—বৃহস্পতিবার (৪ জুন) আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে পদত্যাগপত্র জমা দেন। পুঁজিবাজারে দীর্ঘ সময় ধরে চলমান অস্থਿਰতা, বিনিয়োগকারীদের অসন্তোষ এবং কমিশনের ভেতরের মতপার্থক্যগুলোকে সূত্র ধরে এই পদত্যাগের ঘটনাকে সংযুক্ত করা হচ্ছে। কমিশনারদের পক্ষ থেকে পদত্যাগের ব্যাপারে তত্ক্ষণাৎ আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি পাওয়া যায়নি।
এ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সম্প্রতি একটি সেমিনারে বলেছেন যে পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতেই বিএসইসিকে নতুনভাবে সাজানো হচ্ছে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে, রাজনৈতিক বিবেচনা ছাড়াই পরিচালিত হয়েছে। পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন নতুন নেতৃত্ব বাজারে সুশাসন, বিনিয়োগকারীর আস্থা পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সমস্যার সমাধানে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারবে।
বিদায়ী চেয়ারম্যান রাশেদ মাকসুদ একটি বিবৃতিতে বলেছেন, তাদের দায়িত্বকাল ২১ মাসে কমিশন বেশ কিছু আইনি ও নীতিগত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তার দাবি, কমিশন মার্জিন ঋণ, প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও), মিউচুয়াল ফান্ড, ঋণপত্র ও হুইসেলব্লোয়ার সম্পর্কিত পাঁচটি বিধিমালা গেজেটে প্রকাশ করেছে; পাশাপাশি কর্পোরেট গভর্ন্যান্স, অডিট ও কর্পোরেট পুনর্গঠন বিষয়ে তিনটি খসড়া বিধিমালাও জনমত গ্রহণের জন্য প্রকাশ করা হয়েছে। তারা দুইটি গুরুত্বপূর্ণ আইনের—বিএসইসি আইন ও ক্যাপিটাল মার্কেট স্ট্যাবিলাইজেশন ফান্ড আইন—খসড়া তৈরি করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কাছে পাঠিয়েছে বলে তিনি জানান।
রাশেদ মাকসুদ আরও বলেছেন যে তার নেতৃত্বে কমিশন কমপ্লায়েন্স ও এনফোর্সমেন্ট জোরদার করেছে এবং বিনিয়োগকারী সচেতনতা বৃদ্ধির বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে; ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার বৃদ্ধি, শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ভিডিও প্রতিযোগিতা ও তৃণমূল পর্যায়ের কর্মসূচির মাধ্যমে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বাজার সম্পর্কে জ্ঞান বাড়ানোর চেষ্টা হয়েছে। তবু তার মেয়াদে পুঁজিবাজারে ধারাবাহিক দরপতন, লেনদেন কমে যাওয়া ও বিনিয়োগকারীদের অসন্তোষের মতো চ্যালেঞ্জ অব্যাহত ছিল।
পুঁজিবাজারের বিভিন্ন অংশের দাবি ও সমালোচনার মধ্যে নতুন নেতৃত্বের সামনে প্রধান কাজ হিসেবে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা, বাজারে শৃঙ্খলা স্থাপন এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার বাস্তবায়ন করা রয়েছে। বাজারবিশেষজ্ঞরা বলছেন, অভিজ্ঞ একজন করপোরেট পরিচালকের নেতৃত্বে পরিকল্পিত ও স্থিতিশীল কৌশল নেওয়া হলে পুঁজিবাজারে ইতিবাচক বদল সম্ভব।