জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ১৯৮৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ১৭৫ জন শান্তিরক্ষী শহীদ হয়েছেন বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা দিবসের এই বিশেষ দিনে আমি বিশ্বের সেইসব সাহসী শান্তিরক্ষীদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি, যারা বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার মহান দায়িত্বে থাকাকালীন নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন।
বুধবার সকাল (১০ জুন) ঢাকা সেনানিবাসের সেনাকুঞ্জে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত থাকাকালে ২০২৫ সালে সুদান সম্পৃক্ত এক হামলায় শাহাদাতবরণকারী ছয়জন সেনাসদস্যের পরিবারের সদস্যদের সম্মাননা প্রদান করা হয়। এছাড়া চলমান বিভিন্ন মিশনে আহত সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদেরও সম্মাননা দেওয়া হয়।
প্রধানমন্ত্রী ভার্চুয়ালি দেশের শান্তিরক্ষী সদস্যদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। তিনি বলেন, ১৯৮৮ সাল থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ১৭৫ জন শান্তিরক্ষী শহীদ হয়েছেন। অনেকেরই আহত হওয়ার দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটেছে। আমি তাদের জন্য আল্লাহর কাছে মাগফিরাত কামনা করছি এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আজকের এই বিশেষ দিনে তাদের পরিবারকে সম্মান জানিয়ে আমি গর্ব করি, কারণ শান্তির জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করে তারা এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাদের এই আত্মদানে বিশ্বজুড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার অংগীকার আরও দৃঢ় হয়।
তিনি বলেন, শুধু মাতৃভূমির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নয়, শান্তিরক্ষীদের এই আত্মত্যাগ বিশ্ব শান্তির জন্য এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশের সশস্ত্র ও পুলিশ বাহিনী এখন পর্যন্ত ২ লাখের বেশি শান্তিরক্ষী পাঠিয়ে বিভিন্ন দেশে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেছে। বর্তমানে আরও প্রায় ৫৮৬০ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বিশ্বের বিভিন্ন পরিস্থিতিতে দায়িত্বে রয়েছেন, যার মধ্যে হাইতিতে নতুন মিশনে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীদের মধ্যে প্রায় ১১ শতাংশ নারী সেনা সদস্য যে সাহসের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন তা অনন্য। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, ভবিষ্যতেও নারী শান্তিরক্ষীরা দায়িত্ব পালনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের এই অর্জন বিশ্বমঞ্চে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে, কারণ বহু বছর ধরে তাদের কঠোর পরিশ্রম এবং পেশাদারিত্বের ফল এই সাফল্য এসেছে।
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে সেনাবাহিনীর ভূমিকার কথা, যেখানে এক মেজর বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। এই গৌরব এবং অহংকার আমাদের সামর্থ্যের অনুপ্রেরণা। সেনাবাহিনী যেন এই গৌরব মনে রেখেই দায়িত্ব পালন করে, সেটি তাদের দায়িত্ব।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কাজেও বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী আন্তর্জাতিক মর্যাদা পেয়েছে। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছু অপতৎপরতা ও ষড়যন্ত্রও দেখা গেছে, যা দেশের ও বাহিনীর ইমেজ নষ্টের চেষ্টা করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, ৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ইতিহাস স্মরণ করে বললেন, বাহিনীর ঐক্য ও পেশাদারিত্বের মানদণ্ড ছাড়া সম্মান টেকসই নয়।
তিনি আরও বলেন, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে এখন বাংলাদেশ একটি ফ্যাসিবাদমুক্ত দেশ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করছে, যেখানে সব সরকারি ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নিজেদের যথাযথ মর্যাদায় পরিচালিত হচ্ছে। প্রতিটি নাগরিক—সরকারি কর্মকর্তা, সৈনিক বা সাধারণ মানুষ—সবারই দায়িত্ব দায়িত্বশীলতার সঙ্গে পালন করতে হবে।
বিশ্বের পরিবর্তিত পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন, দ্রুত প্রযুক্তির বিবর্তন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে শান্তিরক্ষা কাজে নতুন চ্যালেঞ্জগুলো অনেক জটিল হয়ে উঠেছে। যেন এই মিশনগুলো আরও আধুনিক, দূরদর্শী এবং প্রযুক্তি-সঙ্গত হতে হবে। এজন্য সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এসব উন্নয়নে।
