সরকার এখন অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া গুজব, অপপ্রচার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-নির্ভর বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের বিরুদ্ধে কঠোর লড়াই চালাচ্ছে। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো সংবাদ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করে, অবৈধ ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের প্রবাহ বন্ধ করা। সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে গুজব, সরকারের প্রধান ব্যক্তিবর্গ, গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান ও নেতাদের বিরুদ্ধে ভুয়া খবর ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি বিভ্রান্তিকর ভিডিও ও ছবি প্রচার করে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে। এসব পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য সরকার নতুন আইনপ্রণয়ন ও প্রযুক্তিগত নজরদারি জোরদার করছে। দেশের সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনের মাধ্যমে এসব অপরাধের দমন করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি আইনি ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হবে। ভুয়া ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে সরকারের উচ্চস্তরের ব্যক্তিবর্গের চরিত্রহনন ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারেও জড়িত রয়েছে। এসবের ফলে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী উপদেষ্টা ড. মাহদী আমিন এসব উদ্বেগের কথা ব্যক্ত করেছেন। বিএনপি নেতারাও এ ধরনের অপপ্রচারের কড়া নিন্দা জানিয়েছেন। সরকারের এক দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, রাজনৈতিক অস্থিরতা সৃষ্টি, রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর জন্য এসব অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। বিশেষ করে নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের নামে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে। সেই জন্য মত প্রকাশের স্বাধীনতা বজায় রেখেই এইসব গুজব ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করছে সরকার। এ জন্য স্বতন্ত্র একটি মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে, যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সঙ্গে ফ্যাক্ট-চেকিং কার্যক্রমও আরও সম্প্রসারিত করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, রাজনৈতিক বিরোধের সুযোগে ব্যক্তিগত চরিত্রহনন, মিথ্যা প্রচারণা ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে সমাজে বিভাজন সৃষ্টি করা হচ্ছে। এতে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশের পাশাপাশি জনপ্রতিষ্ঠান ও সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, ডিজিটাল ও সামাজিক মাধ্যমের বিস্তারের ফলে বিভ্রান্তিকর তথ্য ভাইরাসের মতো ছড়িয়ে পড়ছে। এজন্য সরকার একটি গণমাধ্যম কমিশন গঠনের পরিকল্পনা করছে, যেখানে এই বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। তারা বলেন, অপপ্রচার দমনের পাশাপাশি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যাতে সীমাবদ্ধ না হয়, সে বিষয়েও সরকার সতর্ক। অতীতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগে কিছু বিতর্কের স্বীকার হলেও এখন তা থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও সচেতনভাবে কাজ করছে সরকার। কেউ যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদি মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে সরকারের বা ব্যক্তিগত সুনাম ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা করে, তাহলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে সরকার মূলত মুক্ত ধারার মত প্রকাশের অধিকারকে সম্মান করে। বিএনপির নেতারা এ প্রসঙ্গে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত চরিত্রহনন ও মিথ্যা প্রচার নিয়ে তারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, একটি বিশেষ মহল পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ বিষাক্ত করার অপচেষ্টা করছে। অন্যদিকে, দলের অন্যান্য নেতারা মনে করছেন, অপপ্রচার ও গুজব রোধে সরকারের আরও শক্তিশালী ও কার্যকর পদক্ষেপ দরকার। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, বর্তমান রাজনীতি ও সামাজিক পরিস্থিতিতে অপপ্রচার ও তথ্যযুদ্ধ বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। নির্বাচনী সময়ে বা গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় প্রসঙ্গে বিভ্রান্তিকর তথ্য ও প্রচারণা বেড়েছে, যা গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সমস্যা মোকাবেলায় তথ্য প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার, ভুয়া তথ্য দ্রুত শনাক্ত এবং দায়িত্বশীল ডিজিটাল সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার ও বিভিন্ন সংগঠন। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) জানিয়েছে, গুজব মোকাবেলায় সব ধরনের অনলাইন কনটেন্ট ও লিংক পর্যবেক্ষণ ও অপসারণের কাজ চলছে, যা অব্যাহত থাকবে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যাতে অংশীদারিত্ব ও সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। সূত্র: এশিয়া পোষ্ট।

