বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে ব্যক্তি খাতের করকাঠামোতে এমন পরিবর্তন আছে যা তুলনামূলকভাবে কম আয়ের মানুষের ওপর করবোজ আরও বাড়াচ্ছে।
রোববার (২১ জুন) রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে আয়োজিত বাজেট পর্যালোচনা সংলাপে সিপিডি এই উদ্বেগ জানিয়েছেন। অনুষ্ঠানে কেন্দ্রীয় বক্তব্য উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন; অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। আলোচনা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম (জুনায়েদ সাকি), জাতীয় নাগরিক পার্টি থেকে সংসদ সদস্য আখতার হোসেন এবং বিভিন্ন গবেষণা ও বাণিজ্য সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
ফাহমিদা খাতুন ব্যাখ্যা করেন, প্রস্তাবিত করকাঠামো বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে যাদের বার্ষিক করযোগ্য আয় ৬ লাখ থেকে ১৫ লাখ টাকার মধ্যে, তাদের ক্ষেত্রে করদায় বাড়তি চাপ দেখা দেবে। সিপিডির বিশ্লেষণে এই গ্রুপে করদায়ের বৃদ্ধি প্রায় ১২.৫ শতাংশ থেকে ১৬.৭ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। অন্যদিকে বার্ষিক আয় ৩০ লাখ টাকার বেশি যারা, তাদের করদায় কেবল প্রায় ৭.৬ শতাংশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তিনি বলেন, এই ধরণ সামাজিক সমতা ও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
সিপিডি আরও মন্তব্য করেছে যে, সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ১৮ মাসে এক কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যের স্পষ্ট প্রতিফলন প্রস্তাবিত বাজেটে দেখা যাচ্ছে না। ফাহমিদা জানান, শ্রম, প্রবাসী কল্যাণ, শিল্প ও বাণিজ্য—এই চার মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ বা বরাদ্দের কার্যকারিতা মোট ব্যয়ের অনুপাতে কমছে কিংবা স্থবির রয়েছে। পটুয়াখালী ইপিজেড, জামদানি ভিলেজের মতো বড় কর্মসংস্থানমুখী প্রকল্পগুলোও বছরের পর বছর ধরে ঝুলে আছে, ফলে কর্মসংস্থা বৃদ্ধির পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ নেবে কি না সন্দেহ আছে।
ফাহমিদা বলেন, ‘একটি সুসংগঠিত জাতীয় কর্মসংস্থান কর্মসূচি এবং প্রয়োজনীয় নীতি-সংস্কার ছাড়া এক কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যমাত্রা কেবল রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা হিসেবে থেকেই যেতে পারে।’
বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ধরা হয়েছে, তবে চলতি অর্থবছরের মে মাস পর্যন্ত গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৬৩ শতাংশ। সিপিডি শাখায় বলা হয়েছে, খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বিচক্ষণ মুদ্রানীতি গ্রহণ ছাড়া এই লক্ষ্য অর্জন করা কঠিন।
অনুষ্ঠানে বাজেটের অন্যান্য দিক নিয়েও মত বিনিময় হয়। পিপিআরসি-এর নির্বাহী চেয়ার হোসেন জিল্লুর রহমান, র্যাপিড-এর চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ, বিজিএমইএ’র জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ইনামুল হক খান এবং গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষ প্রস্তাবিত বাজেট নিয়ে তাদের মূল্যায়ন তুলে ধরেন।
ফাহমিদা খাতুন উল্লেখ করেন, যদিও এবারের বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে—এটি ইতিবাচক—তবু সেই বরাদ্দ বাস্তবায়নে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ ও কার্যকর বাস্তবায়ন সংক্রান্ত উদ্বেগ রয়েছে। সংক্ষেপে, প্রস্তাবিত বাজেট সমাজের বিভিন্ন স্তরে ভিন্নভাবে প্রভাব ফেলতে পারে এবং বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের ওপর নিরুপক যুক্তিতে করের বোঝা বাড়ছে বলে সিপিডি সতর্ক করেছেন।