ব্যক্তিগত নিরাপত্তারক্ষী থাকা অবস্থায় জাতীয় টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানকে ১৫০ থেকে ২০০ জনকে হত্যার দৃশ্য দেখেছেন সেনা সদস্য ইমরুল কায়েস। তিনি বলছেন, তাকে দেখিয়েছেন, কিভাবে গুলি করে এবং ইনজেকশন দিয়ে এসব ব্যক্তিকে হত্যা করা হয়েছে। আজ রোববার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ নিজের জবানবন্দিতে ইমরুল এই তথ্য দেন। তিনি জানিয়েছেন, সাহসে এবং বিবেকের তাড়নায় এই জবানবন্দি দিচ্ছেন, যাতে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন কেউ না হন।
২০১২ সালে সেনাসদস্য হিসেবে যোগদান করা ইমরুল জানান, জিয়াউল আহসানের দেহরক্ষী হিসেবে তার কাজ ছিল সর্বদা তার সঙ্গে থাকা। তিনি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে গিয়েছেন, যেমন জাফলং বর্ডার, ডিজিএফআই অফিস, আর্মি সদর দপ্তর ও প্রধানমন্ত্রী শরীরের নিরাপত্তা সংক্রান্ত কাজে। তিনি বলেন, জিয়াউল আহসানে সঙ্গে থাকাকালীন সময়ে তার কাছে অস্ত্র-গুলি থাকত, তবে কোনও তল্লাশি হতো না। এমনকি আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গেও তার ভালো সম্পর্ক ছিল।
ইমরুলের সাক্ষ্য অনুযায়ী, এক রাতে জিয়াউল আহসান তাকে ফোন করে র্যাব-১-এ যেতে বলে, যেখানে এক বস্তার মধ্যে একটি মরদেহ ছিল। তিনি জানান, এই মরদেহ হয়তো অন্য কোন সাজানো অভিযান কিংবা হত্যাকাণ্ডের অংশ। এর পাশাপাশি তিনি উল্লেখ করেন, কয়েকটি অভিযান ছিল যেখানে তারা সুন্দরবনের জঙ্গলের ভেতরে গুলি চালিয়ে লাশ ফেলে দিয়েছেন। একবার রমজানে ইফতারের সময় দুইজন ব্যক্তিকে ক্রসফায়ারে হত্যা করে এরপর লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
এছাড়াও তিনি জানান, ১১ জন আসামিকে হত্যার জন্য একটি অভিযানে তিনি উপস্থিত ছিলেন, যেখানে তাঁদেরকে নদীতে পানিতে ফেলে হত্যা করা হয়। তাছাড়া, র্যাবের বিভিন্ন আলাদা অভিযানেও তিনি অংশ নিয়েছেন, যেখানে কাউকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। জিয়াউল আহসান একাধিক সময় বিভিন্ন আসামিকে গুলি করে হত্যা করেন, কখনও মাথায় গুলি, কখনও ট্রেলর বা ব্রিজ থেকে ফেলে দেওয়ার মাধ্যমে।
তিনি আরও বলেন, বলেশ্বর নদে কখনো হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে, যেখানে নদীর মোহনায় আসামিদের গুলি করে চিরে ফেলা হত। ভারতীয় সীমান্তে আসামির হস্তান্তর এবং পরবর্তীতে হত্যা করার ঘটনাও তার জবানবন্দিতে স্থান পেয়েছে।
ইমরুল আরও জানিয়েছেন, বিডিআর হত্যাকাণ্ডের পর তিনি দেখেছেন, কতগুলো বিডিআর সদস্যকে ইনজেকশন পুশ করে এবং পলাতক হিসেবে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে। জিয়াউুল আহসান আরও বেশ কিছুবার গুম, খুন ও অপহরণের সাথে জড়িত ছিলেন। জানা যায়, ২০১২ সালে মহাখালী ফ্লাইওভার থেকে ইলিয়াস আলী নামে বিএনপি নেতাকে অপহরণ করে প্রতিদিনের মতো সেটি ছিল ডিজিটাল অপ্রীতিকর কার্যকলাপের অংশ।
জিয়াউলের নানা অপকর্মের মধ্যে, তিনি বহু আসামিকে গুম, হত্যা, অপহরণ ও ভারতীয় সীমান্তে হস্তান্তরের কাজেও জড়িত ছিলেন। অপারেশন ও অভিযানের দিন-রোজা কতকো হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী তিনি।
অন্তশেষে, কান্নাজড়িত কন্ঠে ইমরুল জানান, তিনি দেশের জন্য শপথ নিয়েছেন তবে কখনোই মানুষের জীবন নিয়ে খেলতে চাননি। তিনি বলতে চান, জিয়াউল আহসান নিজের বিবেকের তাড়নায় এই স্বীকারোক্তি দিচ্ছেন কারণ তিনি চান, যেন কোনো সৈনিক এই পরিস্থিতির মুখোমুখি না হয়। তিনি আশা করেন, ন্যায়বিচার হবে, যাতে দেশের মানুষ শান্তির জীবন পায়।
