অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, দেশের জনঅর্থায়ন কাঠামো সংস্কারের মাধ্যমে স্থানীয় ব্যাংক নির্ভরতা ঘুচিয়ে বাজারভিত্তিক ও বিকল্প অর্থায়নের দিকে সরকার ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। তিনি বলেন, এই পরিবর্তন বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে সহায়ক হবে।
মন্ত্রী জানান, স্থানীয় ব্যাংক থেকে উচ্চ সুদে — প্রায় ১০–১৩ শতাংশ — ঋণ নেয়া বেসরকারি বিনিয়োগকে বাধাগ্রস্ত করছে। তাই ২০২৫–২৬ ও ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকার চাইছে বেশি অংশে রূপান্তরিত, নমনীয় এবং বাজারসম্মত অর্থায়ন নিশ্চিত করা।
রোববার (২১ জুন) রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত বাজেট পর্যালোচনা সংলাপে প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানে মূল গবেষণা প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, গত সেভেন-টেন বছরেরও বেশী সময় ধরে তিনি সরকারের অতিরিক্ত ব্যাংক ঋণ গ্রহণকে সমর্থন করেননি। সরকার যখন ১০–১৩ শতাংশ সুদে টাকা নেয়, তখন বেসরকারি খাতের জন্য টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ে এবং সরকারি দায় পরিশোধের প্রশ্নও জাগে। তাই ধাপে ধাপে ব্যাংক-নির্ভরতা কমিয়ে অন্যান্য অর্থায়নের উৎসগুলো সক্রিয় করা হচ্ছে।
বাজেট প্রণয়ন নিয়ে মন্ত্রী জানান, এবার মাত্র দেড় মাসের প্রস্তুতিতে বাজেট সাজাতে হয়েছে, যা সাধারণত ছয় মাসের কাজ। পাশাপাশি পূর্ববর্তী সরকারের কাছ থেকে বড় ধরনের বকেয়া উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে সরকার — যেমন বিদ্যুতের প্রায় ৫০০ কোটি টাকার বকেয়া।
তিনি বললেন, বাজেটের প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ঋণের সুদ বা ডেট সার্ভিসিংয়ে খরচ করতে হবে, যা সরকারি ব্যয়ের সুযোগ বা ‘ফিসকাল স্পেস’কে সংকুচিত করে দিচ্ছে। এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই সরকার স্থানীয় সেবা ও লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে।
মন্ত্রী সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সরাসরি বরাদ্দ জোরদার করার গুরুত্বেও জোর দেন। তিনি বলেন, সহায়তা যেন মাঝপথে কেউ না ধরে সরাসরি গৃহিণী বা পরিবারের যোগ্য সদস্যের অ্যাকাউন্টে পৌঁছায়—তার জন্য পদ্ধতি শক্ত করা হচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে গৃহস্থালী কাজ করা মহিলাদের কাজের স্বীকৃতি দেয়া হচ্ছে; এটা কেবল আর্থিক সহায়তা নয়, পরিবার ও সমাজকে সহায়ক করে তোলার একটি উদ্যোগ। পাশাপাশি প্রতিবন্ধী, কৃষক ও ক্ষুদ্রসহায়তা প্রাপ্তদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরাসরি সেবা বাড়ানো হচ্ছে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ নিয়ে মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সীমাবদ্ধতার মাঝেও জিডিপি অনুপাতে শিক্ষা খাতে বাজেটের ২ শতাংশ ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এটি ধাপে ধাপে ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। শিক্ষার মান উন্নয়ন, ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগানো এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার জন্য স্কিল ডেভেলপমেন্ট, রিস্কিলিং ও আপস্কিলিংয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাছাড়া ‘প্রিভেন্টিভ হেলথ কেয়ার’ বা প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবায় জোর দিয়ে সাধারণ মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমানোর লক্ষ্য রয়েছে।
সংলাপে আরও উপস্থিত ছিলেন পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারমান হোসেন জিল্লুর রহমান, র্যাপিডের চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ, বিজিএমইএ’র যুগ্মসভাপতি ইনামুল হক খান ও গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সভাপতি মন্টু ঘোষসহ অন্যান্য গবেষক ও শিল্প নেতারা, যারা বাজেটের বিভিন্ন দিক নিয়ে মতবিনিময় করেন।