পশ্চিম ও মধ্য ইউরোপসহ বহু অঞ্চলে তীব্র তাপপ্রবাহ আর ‘রেড হিট অ্যালার্ট’ জারি থাকার মাঝেই নতুন সতর্কবার্তা দিয়েছে নাসা। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা বলছে, নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরে ‘সুপার এল নিনো’ শুরু হওয়ার লক্ষণ মিলেছে—যার প্রভাব বৈশ্বিকভাবে অনুভূত হতে পারে।
স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া সিদ্ধান্তে নাসা জানায়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার তথ্য এই সংকেতের মূল উৎস। সেন্টিনেল-৬ মাইকেল ফ্রেইলিচ স্যাটেলাইট, যা ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার সহযোগিতায় পরিচালিত, ৮ জুন নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের কয়েকটি এলাকায় স্বাভাবিকের চেয়ে উচ্চতর সমুদ্রপৃষ্ঠ শনাক্ত করে। নাসার ব্যাখ্যা অনুযায়ী, সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বেড়ে গেলে তা প্রসারিত হয় এবং ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ে—এই উচ্চতা সমুদ্রের তাপমাত্রা ও জলবায়ুর পরিবর্তন বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
‘এল নিনো’ হল একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু প্রক্রিয়া, যেখানে নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেড়ে যায়। যখন এটি অত্যন্ত শক্তিশালী পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন তাকে ‘সুপার এল নিনো’ বলা হয়। এমন অবস্থায় সাগরের তাপমাত্রা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা উভয়ই বেড়ে যায় এবং তা বৈশ্বিক আবহাওয়ায় বড় ধরণের ঝাঁকুনি আনতে পারে।
নাসা সতর্ক করে বলেছে, এবারের সুপার এল নিনো প্রভাব বিস্তারের দিক থেকে ব্যাপক হতে পারে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলেন, এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টিপাত হতে পারে, যখন পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চল—বিশেষত ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায়—খরার ঝুঁকি বাড়বে। এছাড়া বিশ্বজুড়ে অনেক এলাকা তীব্র তাপ অনুভব করবে; ডব্লিউএমও (বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা) জানিয়েছে উত্তর আমেরিকা, মধ্য আমেরিকা, ক্যারিবীয় অঞ্চল, ইউরোপ, উত্তর আফ্রিকা ও এশিয়ার বড় অংশে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে উচ্চ থাকতে পারে। দক্ষিণ গোলার্ধের কিছু অংশ—দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাঞ্চল ও দক্ষিণ আফ্রিকাতেও দীর্ঘ সময় উষ্ণ আবহাওয়া দেখা দিতে পারে।
সেন্টিনেল-৬ প্রকল্পের বিজ্ঞানী ডা. সেভেরিন ফুরনিয়ে উল্লেখ করেছেন, ১৯৯৭ সালের বড় এল নিনোর সঙ্গে চলতি বছরের পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের পরিস্থিতির মিল চোখে পড়ার মতো। ১৯৯৭ সালের ইভেন্টটি ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো হিসেবে বিবেচিত হয় এবং এবারও একইরূপ শক্তিশালী প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সুপার এল নিনো কেবল তাপমাত্রাই নয়, বর্ষাব_pattern_ও বদলে দেয়—কিছু অঞ্চলে অতিরিক্ত বৃষ্টি ও বন্যা, অন্যত্র দীর্ঘমেয়াদী খরার কারণে ফসলহানি ও খাদ্য সঙ্কটের ঝুঁকি বাড়ে। ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী এল নিনো-গুলোতে বিশ্বব্যাপী বড় ধরনের খাদ্য সঙ্কট ও দুর্ভিক্ষ ঘটেছে; কিছু ঘটনায় কয়েক কোটি মানুষের মৃত্যুও হয়েছে বলে ব্যাপক নথি আছে।
বিশ্বব্যাপী প্রশাসন ও নাগরিকদের প্রস্তুতিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া এবং কৃষি, পানি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছে বিশেষজ্ঞরা। নাসা ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক সংস্থাগুলি ভবিষ্যৎ পর্যবেক্ষণ বাড়িয়ে পরিস্থিতি মনিটর করছে, যাতে সময়োপযোগী পূর্বাভাস ও সতর্কতা জারি করা যায়।
