বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান জাতীয় সংসদকে পাশ কাটিয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক চুক্তি বা নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করার আহবান জানিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া মৌলিক চুক্তিসমূহ সংসদে উপস্থাপন করলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনগণের আস্থা অনেক বেশি শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে তিনি পারস্পরিক সম্মান ও সমতার উপর ভিত্তি করে স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার ওপর জোর দিয়েছেন।
শনিবার (২৭ জুন) প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বিদেশ সফর নিয়ে আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে এই মন্তব্য করেন তিনি। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কর্তৃক উত্থাপিত ধন্যবাদ প্রস্তাবের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ডা. শফিকুর বলেন, বাংলাদেশ সবার দেশ; দেশের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর ও স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি প্রতিষ্ঠা করা সময়ের দাবি। তিনি উল্লেখ করেন, বিরোধী দল হিসেবে তারা সরকারের গঠনমূলক উদ্যোগে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।
ডা. শফিকুর বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পাদিত গুরুত্বপূর্ণ চুক্তিগুলো সংসদে উপস্থাপনের আহবান জানিয়ে বলেন, ‘‘সংসদকে পাশ কাটিয়ে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।’’ তার মতে, রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল কেন্দ্র হওয়া উচিত জাতীয় সংসদই। সংসদে চুক্তি উপস্থাপন করলে জনপ্রতিনিধিরা তা পর্যালোচনা করতে পারবেন এবং সরকার ও জনগণের মধ্যে আস্থাও আরও সুদৃঢ় হবে।
প্রধানমন্ত্রীর সফরের প্রসঙ্গে তিনি যোগ করেন, সফরকৃত উভয় দেশই বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত বন্ধু। তবু দেশের চলমান অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলোর দিকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশ এখনও আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দেশ; রপ্তানির তুলনায় আমদানির পরিমাণ বেশি হওয়ায় অর্থনীতিতে ভারসাম্য রক্ষা করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে দেশের রপ্তানি নির্ভর করছে প্রধানত তৈরি পোশাক শিল্প ও জনশক্তি রপ্তানির ওপর। এই নির্ভরতা কমিয়ে নতুন নতুন খাতে রপ্তানি সম্প্রসারণের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এজন্য স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বিদেশ সফরে এসব অর্থনৈতিক বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে এবং আলোচনায় তা প্রতিফলিত হয়েছে।
পররাষ্ট্রনীতির দিকটি স্পষ্ট করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক হবে পারস্পরিক সম্মান, সমতা ও জাতীয় স্বার্থের ভিত্তিতে। স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতিতে কোনো ধরনের বাহ্যিক হস্তক্ষেপ গ্রহণযোগ্য নয়। আন্তর্জাতিক চুক্তি হলে তা উভয় পক্ষের স্বার্থ বিবেচনায় হওয়া উচিত—বাংলাদেশ যেমন অন্য কোনো দেশের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ করতে চায় না, তেমনি নিজের স্বার্থও যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকেও আলাদা গুরুত্ব দিতে হবে।
একই সঙ্গে তিনি রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনেরও আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘‘সরকার সব কৃতিত্ব নেবে আর বিরোধী দল কেবল বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করবে—এমন মনোভাব ত্যাগ করতে হবে।’’ তার মতে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও সহযোগিতার পরিবেশ গড়ে উঠলে রাষ্ট্র পরিচালনাও আরও কার্যকর হবে।
ডা. শফিকুর শেষ করেন যে, সরকারকে বিরোধী দলের মতামতকে সম্মান করতে হবে এবং বিরোধী দলকেও দেশের উন্নয়ন ও রাষ্ট্রগঠনের কাজে ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। এভাবেই গণতান্ত্রিক চর্চা শক্তিশালী হবে এবং জাতীয় স্বার্থে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠিত হবে।