সব শঙ্কা, স্নায়ুযুদ্ধ আর নাটকীয়তার সমস্ত আবহ শেষ হয়ে গেল যোগ করা সময়ের এক ম্যাজিক্যাল স্পর্শে। সবাই যখন ভাবছিল ৯০ মিনিট শেষে ১-১ সমতায় ম্যাচটি শেষ হবে এবং ফল করা যাবে না, তখনই যোগ করা সময়ের পঞ্চম মিনিটে গাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির চমৎকার শটেই জাপানকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে জায়গা করে নিল ব্রাজিল। এই শেষ সর্পিল মুহূর্তে লক্ষ্যভ্রষ্ট না হয়ে গোলটি করার নৈপুণ্য সেলেসাও ভক্তদের মনে দীর্ঘদিন থাকবে।
ম্যাচের প্রথমার্ধ সম্পূর্ণ অন্যরকম গল্প বলছিল। ২৯ মিনিটে ব্রাজিলের ডিফেন্ডার দানিলোর ভুল পাসে বল ছিনিয়ে নিয়ে কাইশু সানো দুর্দান্ত এক ড্রিবলিংয়ের পরে বক্সের বাইরে থেকে বল নিক্ষেপ করে জালে জড়ান। এই গোলের পর জাপান কোচ হাজিমে মোরিয়াসু মাত্রাতিরিক্ত বদ্ধ রক্ষণভঙ্গি নিয়ে ৫-৪-১ সাজে পুরো দলের রক্ষণ বাড়িয়ে দিলেন। সেই বাঁধনেই প্রথমার্ধে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রসহ ব্রাজিলিয়ান আক্রমণভাগ বেশ হারিয়ে ফেলেছিল এবং বিরতিতে জাপান এগিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল।
ম্যাচের শুরু থেকেই বল দখলে ছিলেন ব্রাজিল, আক্রমণ সাজানোর চেষ্টা করছিলেন তারা; হাইড্রেশন ব্রেক পর্যন্ত বল ধরে রেখেও এশীয় প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভাঙতে পারেনি আনচেলত্তির শিষ্যরা। ভিনিসিয়ুস ও মাথেউস কুনিয়া কয়েকটি সুযোগ পেলেও তা কাজে লাগানো হয়নি। অন্যদিকে সানো’র গ্যারান্টিভ এক শটে জাপান প্রথমার্ধেই সাফল্য পায় এবং বিরতিতে এগিয়ে থাকে।
দ্বিতীয়ার্ধে পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নরা খোলস ছেড়ে খেলার চেষ্টা করে। ম্যাচের ৫৬ মিনিটে গ্যাব্রিয়েল মাগালাইসের নিখুঁত ক্রসকে হেডে জালে ভেড়ান কাসেমিরো, ফলে ম্যাচ সমতায় ফেরে। সমতায় ফেরার পর ব্রাজিলের আক্রমণের তীব্রতা বেড়ে যায়; ৫৮ মিনিটে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের একটি চমৎকার ফ্লিক সুজুকির পকেটে ঠেকলেও সেটি পোস্টে লেগে ফিরে আসে।
যুদ্ধের শেষ বিশ মিনিটে কোচ কার্লো আনচেলত্তি কৌশল বদলে মাঠে নামান গাব্রিয়েল মার্তিনেল্লি—এর ফলে এনদ্রিক ও রায়ানের গতি জাপানের ডিফেন্সকে ক্রমে চাপ দিচ্ছিল। জাপানের রক্ষণশীল খেলোয়াড়রা ক্রমশ বাঁধা সৃষ্টি করতে গিয়ে ফাউল করতে শুরু করলে হলুদ কার্ড দেখতে হয় তাদের। ম্যাচের ৮৯ মিনিটে কাসেমিরোর কুঁচকির চোট সিরিয়াস হতে থাকায় তিনি মাঠ ছাড়েন এবং তাঁর জায়গায় আসে ফাবিনিও।
যোগ করা সময়ে এনদ্রিক একটি কর্নার আদায় করেন; সেই কর্নার থেকে আসা সুযোগে ফাবিনিওর হেড বুকমার্কের উপর দিয়ে চলে গেলে ব্রাজিলীয় সমর্থকদের হৃদয় কতটা দ্রুত ধুকছে তা বলা ঠিকঠাক কঠিন নয়। এবং তারপর আসে চূড়ান্ত মুহূর্ত—ব্রুনো গিমারেস মাঝমাঠ থেকে এক তুলনামূলক নিখুঁত পাস বাড়ান গাব্রিয়েল মার্তিনেল্লির পায়ে। মার্তিনেল্লি ঠান্ডা মাথায় গোলের সামনে থেকে দূরের পোস্ট কাষে দুর্দান্ত স্পর্শে বল জালে জড়িয়ে দেন; জাপানি গোলরক্ষক সুজুকির করে তোলার কোন সুযোগ ছিল না।
রেফারির শেষ সাইরেন বাজানো পর্যন্ত জাপান আর ফিরিয়ে আনতে পারেনি। নাটকীয় পরিণতিতে ২-১ ব্যবধানে জয় পেয়েছে ব্রাজিল এবং তারা বিশ্বকাপের শেষ ষোলোয় জায়গা করে নিল—এটা কেবল খেলোয়াড়দের নয়, স্টেডিয়াম ভরা সমর্থকদেরও স্মরণীয় এক সন্ধ্যা হয়ে থাকবে। সেই সঙ্গে কার্লো আনচেলত্তির তৎপর কৌশল এবং পরিবর্তনগুলো এই সফলতার বড় অংশ ছিল; তবু এই জয় এসেছে নেইমারহীন ব্রাজিলের কাঁধে।