জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সংসদে ব্যক্তিগত স্তুতি ও প্রশংসার নামে গান-কবিতা গাওয়া এবং তোষামোদকে ‘ব্যাড কালচার’ হিসেবে চিহ্নিত করে তা সম্পূর্ণভাবে বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, সংসদ কোনো তোষামোদের স্থান নয়; এটি জনগণের ট্যাক্সের টাকায় প্রতিষ্ঠিত দায়িত্ব পালনের মঞ্চ—এখানে কেউ যেন চরিত্র হননের শিকার না হয়, সেই আহ্বান করলেন তিনি স্পিকারের প্রতি।
সোমবার (২৯ জুন) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে চালিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধীদলীয় এই নেতা এসব কথা বলেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, সংসদে সকলের লক্ষ্য হওয়া উচিত দায়িত্ববোধ নিয়ে দেশ ও জনগণের কল্যাণের জন্য কথা বলা, ব্যক্তিকে খুশি করতে গিয়ে অন্যকে আঘাত করা উচিত নয়।
ডা. শফিকুর মনে করিয়ে দেন, সংসদে সবাই জনগণের ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি; এখানে বক্তৃতা কেবল ব্যক্তি প্রশংসার বিস্তৃত জমি নয়। তিনি প্রয়োজনে স্পিকারের মাধ্যমে অতীতের তোষামোদমূলক আচরণ বন্ধ করার প্রয়োজনীয়তা বলছেন যাতে ট্যাক্সদাতাদের টাকা অপব্যয় বা অপমানের কাজে ব্যবহার না হয়।
বাজেট অধিবেশনকে বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেশন আখ্যা দিয়ে তিনি অর্থনীতির বাস্তব চ্যালেঞ্জ এবং বাজেটের রাজনৈতিক ও সামাজিক গুরুত্ব উভয়ের ওপর আলোকপাত করেন। তিনি মরহুম রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, মহানায়ক জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী ও স্বাধীনতা সংগ্রামী আ. স. ম. আবদুর রবদের অবদান স্মরণ করেন এবং ৯০-এর গণআন্দোলন, ২৮ অক্টোবর, পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বরের ঘটনা এবং দীর্ঘসময়ব্যাপী বর্ণনায়র্ণবাদি শাসনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের শহীদ, আহত ও পরিবারগুলোতেও তিনি সমবেদনা প্রকাশ করেছেন।
নিজে所属 দলকে তিনি ‘কষ্টে বোকা দল’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন যে দলের অনেক সিনিয়র নেতাকে একের পর এক হারিয়েছেন; সেক্ষেত্রে দলের দুর্বলতা এবং ক্ষতির ইতিহাসও উল্লিখিত করেন। পিলখানায় নিহত বীর সেনাদের নির্মম হত্যাকাণ্ডকে তিনি জাতির ওপর আঘাত হিসেবে অভিহিত করে তাদের শাহাদাত কবুলের জন্য দোয়া করেন।
বাজেট পেশের প্রসঙ্গে তিনি মাননীয় অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে কম সময়েই ২৩৪ পৃষ্ঠার বাজেট উপস্থাপন করা সহজ কাজ ছিল না। সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন যে কোনো প্রয়াসই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়; তাই বিরোধীপক্ষের হিসেবে তাদের কাজ হবে বাজেটের ত্রুটি-অপচয় চিহ্নিত করা এবং জনস্বার্থে তীক্ষ্ণ নজরদারি চালানো।
সংসদকে একটি চলন্ত যানবাহনের সংমিশ্রণ বলে উদাহরণ দিয়ে তিনি উল্লেখ করেন—সরকার ও বিরোধী দল এই দুটি চাকা; দুটির মধ্যে একটি বিঘ্নিত হলে পুরো সংসদ কার্যক্রম ব্যাহত হবে। তাই উভয় পক্ষকেই সম্মান ও দায়িত্ববোধ বজায় রেখে কাজ করতে হবে; সরকার ভাল কোনো উদ্যোগ নিলে বিরোধী দল কেবল বিরোধিতার টান ধরবে না, এবং বিরোধী দলকেও যুক্তিযুক্ত প্রস্তাবে সহযোগিতার মনোভাব রাখতে হবে।
অর্থনৈতিক বাস্তবায়নের কাঠামো পরিবর্তনের জন্য ডা. শফিকুর উত্তেজনাপূর্ণ প্রস্তাবও দেন—বাজেট বছরের মেয়াদ জুলাই–জুন থেকে ক্যালেন্ডার বছর (জানুয়ারি–ডিসেম্বর) করার সুপারিশ করে তিনি বলেন, বর্তমান ব্যবস্থায় বছরের শেষ দিকে বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেই তাড়াহুড়োতে কাজ করার ফলে প্রথম দশ মাসে মাত্র ৪২ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয় এবং শেষ সময়ে অপচয় ও দুর্নীতির সুযোগ বাড়ে। এই পরিবর্তনে কাজে গতি আসবে এবং অসামঞ্জস্য হ্রাস পাবে বলে তিনি মনে করেন।
শেষে তিনি পুনরায় স্পিকার ও সংসদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে অনুরোধ করেন—সংসদ যেন লোক দেখানো প্রশংসা বা ব্যক্তিগত তোষামোদে নিমগ্ন না হয় বরং দায়িত্বশীল, সম্মানজনক ও গণমুখী আচরণ বজায় রাখুক। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সংসদ হবে একমতবদ্ধ, স্বপ্ন দেখানো ও দেশের জনগণকে এগিয়ে নেওয়ার জায়গা, ক্ষোভ বা অবমাননায় নয়। বাজেট বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দলের যৌক্তিক প্রস্তাব অর্থমন্ত্রী গ্রহণ করলে তা দেশের জন্য কাজে লাগবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।