স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন আগামী শনিবারের মধ্যে দেশের সব বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালের জন্য জরুরি নির্দেশনা দিয়েছেন। তাঁদেরকে বাধ্যতামূলকভাবে নরমাল ডেলিভারি রুম বা লেবার রুম স্থাপন করতে হবে। এ নির্দেশনা অমান্য হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিল করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।
সোমবার (৬ জুলাই) রাজধানীতে বাংলাদেশ মিডওয়াইফারি সোসাইটির আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে কিছু প্রতিষ্ঠান অতিমাত্রায় মুনাফার জন্য স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করছে, যেখানে মানুষের কল্যাণ ও দেশের সার্বিক স্বার্থের চেয়ে অর্থ উপার্জনই তাদের প্রধান লক্ষ্য। এতে অসুবিধা হওয়ার পাশাপাশি স্বাভাবিক প্রসবের হার কমে গেছে এবং সিজারিয়ানের প্রবণতা বেড়েছে।
মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, আগে দেশের গ্রামে অভিজ্ঞ দাইয়ের মাধ্যমে নিরাপদ স্বাভাবিক প্রসবের ঐতিহ্য ছিল। কিন্তু উন্নত চিকিৎসা সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এখন অপ্রয়োজনীয় সিজারিয়ানের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় স্বাভাবিক প্রসবের হার কমে যাচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, অনেক সময় গর্ভাবস্থার প্রথম থেকেই দালালচক্র ও কিছু চিকিৎসাকেন্দ্র পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে জটিলতার আশঙ্কা দেখিয়ে সিজারিয়ানের জন্য চাপ দেয়। এমন পরিস্থিতিতে মা ও সন্তানকে ঝুঁকির মধ্যে রাখা হয়, যা অপ্রয়োজনীয় মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তিনি বলেন, এইসব পরিস্থিতিতে চিকিৎসকদের নৈতিকতা মেনে চলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুর পুষ্টির প্রতি আরও গুরুত্ব দিতে হবে। শিশুর জীবন শুরু থেকেই পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে, কারণ অপুষ্টি, কম বয়সে বিয়ে ও মায়ের দুর্বল স্বাস্থ্যের কারণে শিশু ও মায়ের নানা জটিলতা দেখা দেয়। অনেক শিশু চরম অপুষ্টিতে ভুগছে, পাশাপাশি অনেক মা নিজের শরীরের যথাযথ পুষ্টি না পেয়ে থাকেন, যা নবজাতকের পুষ্টির জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।
তিনি আরও জানান, দেশের প্রতিটি এলাকায় দক্ষ মিডওয়াইফের সেবা নিশ্চিত করতে হবে। এর মাধ্যমে শুধু কর্মসংস্থানই নয়, দেশের স্বাস্থ্যসেবা উন্নত হবে। চলতি বছরে তারা এক লাখ নতুন কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা করছেন, এর মধ্যে প্রায় ৮০ হাজার নারী, যারা অধিকাংশই মিডওয়াইফ হিসেবে কাজ করবেন, যাতে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও মাতৃস্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে যায়।
অতঃপর, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঘোষণা দেন যে, আগামী শনিবারের মধ্যে সব বেসরকারি ক্লিনিকে লেবার রুম স্থাপন করতে হবে। এ নির্দেশনা মানতে না চাওয়া কোনও ক্লিনিকের লাইসেন্স বাতিল করা হবে এবং তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হবে। সেই সঙ্গে, সব বেসরকারি ক্লিনিকে মিডওয়াইফ নিয়োগের বাধ্যবাধকতা চালু করা হচ্ছে, যাতে গর্ভবতী নারীরা স্থানীয় পর্যায়ে ভর্তি ও পরামর্শ পেয়ে স্বাভাবিক প্রসবের জন্য উৎসাহিত হন।
তিনি আরো বলেন, ভয়ভীতি ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা গ্রহণের সংস্কৃতি থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে। মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুশৈশ্য নিশ্চিত না করে একজন সমৃদ্ধ ও টেকসই অর্থনীতি গড়া সম্ভব নয়।
শেষে, মিডওয়াইফদের সংগঠন গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এ ধরনের সংগঠন মাতৃস্বাস্থ্যসেবার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কর্মশালায় জানানো হয়, প্রতি ৪০টি নরমাল ডেলিভারি সম্পন্ন হলে একজন দাই রেজিস্ট্রেশন পান। এক বছরে প্রায় ৫৮০০ দাই দক্ষ হয়ে উঠলেও তাদের কাজের সুযোগের অভাবে অধিকাংশই সাধারণ নার্স হিসেবেই কাজ করেন। বিশেষ করে প্রাইভেট হাসপাতালে শুধুমাত্র ৫০০ দাই কাজের সুযোগ পান, বাকিদের কাজের সুযোগ খুবই কম। এর কারণে শিশু জন্মের সময় নানা দুর্ঘটনা ঘটে থাকছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ মিডওয়াইফারি সোসাইটির (বিএমএস) সভাপতি রোজিনা খাতুন, সাধারণ সম্পাদক হাসনা আখতার, এবং বাংলাদেশ নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি কাউন্সিলের রেজিস্ট্রার হালিমা আখতার সহ আরো অনেকে।

