প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘আমাদের চিকিৎসকেরা আমার মাকে যে সেবা দিয়েছেন, সে ধরনের মানবিক টেককেয়ার বিদেশে পাওয়া যায় না।’ শনিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) ও হাসপাতালের ৮০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে তিনি এ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘এই দেশের প্রখ্যাত কয়েকজন চিকিৎসক আমার মাকে দীর্ঘ বছর ধরে চিকিৎসা দিয়েছেন। প্রত্যেক মুহূর্তে তারা তাকে চিকিৎসা ও যত্ন দিয়ে গেছেন। এমন মানবিক সেবা বিদেশে পাওয়া অত্যন্ত কঠিন। এমনকি মৃত্যুর কাছাকাছি থাকা অবস্থায়ও আমার মা বিদেশে গিয়েছিলেন, কিন্তু সেখানে যে আন্তরিকতা এবং মানের সেবা আমাদের দেশেই পাওয়া গেছে, তা কোনো বিদেশি হাসপাতালে মেলে না।’ তিনি যোগ করেন, ‘অবশ্যই প্রযুক্তিগত দিক থেকে বিদেশে উন্নত সুবিধা ও ইকুইপমেন্ট পাওয়া যেতে পারে, তবে হৃদয় থেকে দেওয়া এই মানবিক সেবা বাস্তবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে ওনার জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত যে সেবা দেয়া হয়, তা অত্যন্ত আন্তরিক ও নিঃস্বার্থ।’ প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘ঢাকা মেডিকেল কলেজ শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, এটি ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী। ভাষা আন্দোলনে, মহান মুক্তিযুদ্ধে, ৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনেও এই কলেজের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। সম্প্রতি Juli আন্দোলনেও মেডিকেল কলেজের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীরা শহীদ ও আহতদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এই প্রতিষ্ঠান শুধু দক্ষ চিকিৎসক তৈরি করে না, বরং শিক্ষক, গবেষক, সমাজ উন্নয়নকামী নেতা ও মুক্তিযোদ্ধাও গড়ে তোলে।’ তিনি চিকিৎসকদের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘ঢাকা মেডিকেল এখন রাজধানীর মানুষের নির্ভরতার প্রতীক। যারা চিকিৎসা সেবা দিয়ে থাকেন, তারা মানুষের মনোজগৎতে পরম ভরসার স্থান করে নেন। যখন কেউ বিপদে পড়েন, তখন তাদের সবচেয়ে কাছের মানুষ হিসেবে মনে করেই যান।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর— এই ভাবনা আমাদের আরও গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। একজন রোগীকে চিকিৎসার জন্য খরচ হয় বহু রকম, তবে যদি আগাম সতর্কতা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তা হলে সরকার আরেকটু কম খরচে চলে। এজন্য তিনি বলেন, ‘প্রাতিষ্ঠানিক ও বাড়ির ভেতরে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে আমরা বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও প্রচার চালাচ্ছি, যেন রোগের প্রকোপ কমে আসে।’ তিনি আশা ব্যক্ত করেন, ইন্টার্নরা সম্পৃক্ত হলে উর্ধ্বসীমা ছাড়ায় চিকিৎসায় বিদেশে মুখাপেক্ষিতা বন্ধ হবে। বলেন, ‘সরকার স্বাস্থ্যখাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আধুনিক অবকাঠামো ও জনবল বৃদ্ধির কাজ ত্বরান্বিত করছে। চিকিৎসকদের প্রশিক্ষণে, দরকারি পদে দ্রুত নিয়োগ ও শূন্যপদ পূরণের জন্য কার্যক্রম চালু হয়েছে।’ “Prevention is better than cure” (প্রতিরোধই দুর্যোগের মূল) এই নীতি অনুযায়ী, সরকার প্রত্যেককে প্রাথমিক ও গণস্বাস্থ্য পরামর্শ দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে পুলিশ, নার্স, চিকিৎসকসহ এক লাখের বেশি স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সরকার। এরপর বললেন, ‘শিক্ষাখাতে ভারতের মতোই স্বাস্থ্য খাতেও প্রবৃদ্ধির জন্য বাজেট বাড়ানো হয়েছে। এই বছর স্বাস্থ্যবিভাগে জোটের বরাদ্দ দাঁড়িয়েছে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা, যা দেশের মোট জিডিপির ১.০২ শতাংশ। আগামী পাঁচ বছরে এই অনুপাত আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘চিকিৎসা ব্যয়ের কারণে অনেক পরিবার হাসপাতালে যেতে পারে না। তাই ডায়ালাইসিস, হার্টের স্টেন্ট, পেসমেকারসহ গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাসামগ্রীতে কর কমানো বা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ ও হাসপাতালের সংখ্যা বাড়ানোর দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে ৫০০ উপজেলার মধ্যে মাত্র পাঁচটি ১০০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল রয়েছে, যা অপ্রতুল। তাই সব উপজেলায় ৩১ থেকে ৫১ শয্যার হাসপাতালগুলো পর্যায়ক্রমে ১০১ শয্যায় উন্নীত করা হবে। এছাড়া, সব হাসপাতালের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে বিশ্বমানের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নিশ্চিতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিশু স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে বরিশাল ও রাজশাহীতে নির্মিত ২০০ শয্যার শিশু হাসপাতালসহ মোট পঞ্চাশটি শিশু হাসপাতালে দ্রুত কার্যক্রম শুরু হবে, যা দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশেষায়িত শিশুরোগী চিকিৎসা সহজলভ্য করবে। তিনি মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে বলেন, স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে মেডিক্যাল বর্জ্য বিজ্ঞানসম্মতভাবে অপসারণ করতে হবে, যাতে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি না হয়। তিনি আরও বলেন, সরকার সারা দেশে এক লাখ হেলথ কেয়ারার নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছে, যেখানে ৮০ শতাংশ নারীকামী হেলথকর্মী থাকবেন। যারা প্রতিদিন মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিচ্ছেন। এছাড়া, আরও পাঁচ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হয়েছে। হাসপাতালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে, প্রত্যেক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১০ জন করে আনসার সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেষ করলেন, বললেন, ‘আমরা সবাই একসঙ্গে কাজ করে একটি সুস্থ ও স্বল্পদূরপ্রবেশের স্বাস্থ্য পরিষেবা নিশ্চিত করবো। স্বাস্থ্যখাতের এই উন্নয়নের মূল ভিত্তি মানবিকতা ও সততা, যা বাংলাদেশকে আরও সুস্থ ও উন্নত দেশের পথে এগিয়ে নেবে। এই মেডিকেল কলেজের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসের জন্য আমি কৃতজ্ঞ ও গভীর শ্রদ্ধা জানাই।’
