বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা হিসেবে স্বীকৃত হয়ে আছেন ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হোলি আর্টিজান বেকারি হামলা। এই হামলায় দেশি-বিদেশি মোট ২০ জন নিহত ও বহু ব্যক্তি আহত হন। সেদিন রাতে শুরু হওয়া জিম্মি পরিস্থিতি ও হত্যাকাণ্ডের পর সেনাবাহিনীর সফল উদ্যোগে অভিযান চালিয়ে ব্যাপক আতঙ্কের অবসান ঘটানো হয়।
শহরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ইফতারের পর একদল সশস্ত্র তরুণ গুলশানের কূটনৈতিক এলাকায় অবস্থিত হোলি আর্টিজান বেকারিতে প্রবেশ করে হামলা চালায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধারণা অনুযায়ী, হামলাকারীরা নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির সদস্য। হামলার রাতে তারা একের পর এক গুলি চালায়, হতাহত হন বহু নিরীহ মানুষ। ভোরের দিকে সেনা কমান্ডো অভিযানে পাঁচ হামলাকারী নিহত হয়।
নিহতদের মধ্যে ছিলেন নিবরাজ ইসলাম, শফিকুল ইসলাম (উজ্জ্বল), মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ এবং খায়রুল ইসলাম (পায়েল)। হামলার কয়েক দিন আগে তারা তাদের নিজ নিজ বাড়ি ছেড়ে নিখোঁজ হয়েছিলেন।
আহতদের মধ্যে রয়েছে ৯ ইতালীয়, ৭ জাপানি, একজন ভারতীয়, দুজন বাংলাদেশি এবং একজন বাংলাদেশি-আমেরিকান নাগরিক। আরও অবহেলাযুক্ত হন দুই পুলিশ কর্মকর্তা যারা এই আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য জীবন উৎসর্গ করেন। নিহত দুই পুলিশ কর্মকর্তার স্মরণে গুলশানের থানার সামনে নির্মিত ‘দীপ্ত শপথ’ ভাস্কর্যটি ২০২৪ সালে আন্দোলনের সময় ভেঙে পড়ে, যা এখনো পুনর্নির্মাণ হয়নি।
প্রথমে প্রতিবছর নিহতদের স্মরণে বিভিন্ন সংগঠন পৃথকভাবে শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রদান করত। তবে, গত বছর এই কার্যক্রম স্থানান্তর হয়, এবং এবার ইতালি দূতাবাসসহ অন্যান্য দূতাবাস সমন্বিত করে একটি স্মরণসভা আয়োজনের পরিকল্পনা হয়েছে। তবে, হামলার স্থানেএকটি আনুষ্ঠানিক শ্রদ্ধা নিবেদনের উদ্যোগ দেখা যায়নি।
আন্তর্জাতিক মহলেও এই হামলার গুরুত্ব ছিল ব্যাপক। কারণ এতে বহু বিদেশি নাগরিকের জীবন ঝরে যায়, যা বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে বেশ সাড়া ফেলে। হামলার তদন্তে পুলিশের গতি বৃদ্ধি পায়, এবং দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়ায় ২০১৯ সালের নভেম্বরে সাত আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে হাইকোর্ট তাদের মৃত্যুদণ্ড বাতিল করে আমৃত্যু কারাদণ্ডে রূপান্তর করে। এই সাত জনের মধ্যে জাহাঙ্গীর হোসেন (রাজীব গান্ধী), আসলাম হোসেন (র্যাশ), হাদিসুর রহমান, রাকিবুল হাসান (রিগ্যান), আব্দুস সবুর খান, শরিফুল ইসলাম (খালেদ) ও মামুনুর রশিদ রিপন রয়েছেন।
অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য অনুসারে, হামলার মূল পরিকল্পনাকারীরা পরবর্তীতে বেশিরভাগই বিভিন্ন অভিযানে নিহত হয়েছেন। এই বিভীষিকার ঘটনা বাংলাদেশের সার্বভৌমিক ইতিহাসের এক কলংকময় অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

